আইন-আদালত

চাঁদপুরের সেলিম চেয়ারম্যানসহ ৩ জনকে কোটি টাকা জরিমানা

প্রস্তাবিত চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে অধিগ্রহণের জন্য জমির মূল্যহার পরীক্ষায় কমিটি গঠন ও ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১৯৪ কোটি টাকার প্রাক্কলনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট খারিজ করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রায়ে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতির দায়ে ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তার দুই সহযোগীকে এক কোটি টাকা জরিমানা করেছেন হাইকোর্ট। এর মধ্যে সেলিম খানকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হবে।

আর ২৫ লাখ টাকা করে বাকী দুজনকে দিতে হবে। তারা হলেন, স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল ও আবদুল কাদের মিয়া। রিট আবেদনকারীদের দুই মাসের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেলিম খান চাঁদপুর সদর উপজেলার ১০ নম্বর লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান।

বৃহস্পতিবার (৯ জুন) বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিইসি ও অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান আসাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হাসান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নাসিম ইসলাম রাজু।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হাসান জানান, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে যেসব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় জেলা প্রশাসন করেছে, তা সঠিক বলে রায় এসেছে। কিন্তু রিট আবেদনকারীরা জাল ডকুমেন্ট দিয়ে আদালতের সময় নষ্ট করেছেন। এসব বিবেচনায় নিয়ে রুল খারিজ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে সেলিম খানকে ৫০ লাখ টাকা ও অপর দু’জনকে ২৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করেছেন আদালত।

এর আগে এই রিটের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত ৩ মার্চ হাইকোর্টের এ বেঞ্চ রায়ের জন্য ২০ এপ্রিল দিন ধার্য করেছিলেন। এর মধ্যে বেঞ্চটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। তাই নির্ধারিত দিনে রায় ঘোষণা করা হয়নি। আজ বেঞ্চটি বিশেষভাবে বসে এই রায় ঘোষণা করেন।

চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন মন্ত্রিসভা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর। জাতীয় সংসদে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয় ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২১ সালের ৬ এপ্রিল।

প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১৯৪ কোটি টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করে অর্থ ছাড়ের জন্য গত বছরের ৪ নভেম্বর উপাচার্য বরাবর চিঠি দেয়। একই বছরের ১৪ অক্টোবর জমির মূল্যহার পরীক্ষা ও সংগ্রহের জন্য ১৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন।

আর এতে আপত্তি জানিয়ে জেলা প্রশাসনের প্রাক্কলন সংশোধন চেয়ে গত বছরের নভেম্বরে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন মো. সেলিম খান ও অন্যরা। পরে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চায় মন্ত্রণালয়। চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিবেদন পাঠায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৌজা দর ধরে জমি অধিগ্রহণের দাম নির্ধারণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে ৬২ একর জমির জন্য (মূল দামের তিন গুণ ধরে) সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১৯৪ কোটি টাকা। কিন্তু হঠাৎ উচ্চ মূল্য দেখিয়ে যেসব দলিল করা হয়েছে, সেটা আমলে নিলে সরকারকে ৫৫৩ কোটি টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ সরকারকে অতিরিক্ত ৩৫৯ কোটি টাকা দিতে হবে।

এ অবস্থায় চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের মূল্যহার পরীক্ষায় কমিটি গঠন (১৪ অক্টোবর) ও ১৯৪ কোটা টাকা প্রাক্কলন (৪ নভেম্বর) স্মারকের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সেলিম খান ও তার ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি হাইকোর্টে পৃথক রিট করেন। গত বছর করা পৃথক রিটে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইনের ৯ (১) (ক) ধারা অনুযায়ী প্রাক্কলন নির্ধারণের নির্দেশনাও চাওয়া হয়।

সেলিম খানের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রুল দেন। অপর রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ৩০ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল দেন। পৃথক রিটের ওপর একসঙ্গে শুনানি হয়।

সম্প্রতি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে সেলিম খানকে। তিনি চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। শনিবার (৪ জুন) সকালে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমে তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু নঈম পাটোয়ারী দুলাল জানান, দলের নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এফএইচ/ইএ/জেআইএম/জেএস/এমআরএম/জিকেএস