ক্যারিয়ার গড়তে ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন রিতু আক্তার। মিরপুর বয়েজের জার্সিতে ২০১৬ সালে নারী প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে অংশ নিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এক ধাপ এগিয়েও গিয়েছিলেন গাইবান্ধার নশরতপুর গ্রামের কিশোরী।
কিন্তু ক্রিকেট আর অ্যাথলেটিকসের টানাটানির পর শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়টিকেই বেছে নিয়েছেন রিতু। উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি, যে কারণে পেস বোলিং করতেন। ক্রিকেট এখন রিতুর জীবনে অতীত। তিনি স্বপ্ন দেখছেন অ্যাথলেটিকসের হাইজাম্পে। স্বপ্ন দেখাচ্ছেন দেশের অ্যাথলেটিকসকেও।
২১ বছর বয়সী রিতু আক্তার এখন অ্যাথলেটিকসে চেনামুখ। দেশে এখন দুই নারী হাইজাম্পে আলো ছড়াচ্ছেন। অন্যজন উম্মে হাফশা রুমকী। এই দুইজনের মধ্যেই এখন দেশসেরা নারী হাইজাম্পার হওয়ার লড়াই। একবার রুমকী জেতেন তো, অরেকবার রিতু।
গত জানুয়ারীতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ১.৭১ মিটার লাফিয়ে স্বর্ণ জিতেছেন রুমকী। ১.৬৬ মিটার লাফিয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন রিতু। আগেরবার হয়েছিল এর উল্টো-রুমকীকে হারিয়ে স্বর্ণ জিতেছিলেন রিতু। সেবার তিনি ১.৭০ মিটার লাফিয়ে জাতীয় রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জিতেছিলেন।
৯ থেকে ১৮ আগস্ট তুরস্কের কনিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য ইসলামী সলিডারিটি গেমসে বাংলাদেশের যে তিনজন অ্যাথলেট অংশ নেবেন তার একজন রিতু আক্তার। এটিই হবে তার ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নেওয়া।
প্রথমবার দেশের বাইরে খেলতে যাওয়ার রোমাঞ্চের চেয়ে রিতুর বেশি মনযোগ নিজের পারপরম্যান্স নিয়ে। এখন অনুশীলনে ১.৭৭ মিটার লাফাচ্ছেন। যেটা তার ক্যারিয়ারসেরা। এই উচ্চতাকে গেমসে আরো ওপরে নিতে চান রিতু। সমান হলেও একটা পদক আসতে পারে বলে প্রত্যাশা তার।
এর আগের ইসলামী সলিডারিটি গেমসে স্বর্ণ পাওয়া অ্যাথলেট লাফিয়েছিলেন ১.৮০ মিটার। রৌপ্য ছিল ১.৭৭ ও ব্রোঞ্জের ১.৭৪। রিতু অনুশীলনের পারফরম্যান্সটা গেমসে ধরে রাখতে পারলে একটা পদকের আশা করা যেতেই পারে।
‘আশা আমি করতেই পারি। তবে, কথা হলো অন্যরা তো আর ওই জায়গায় বসে নেই। তারা কতটুকু উন্নতি করেছে সেটাও দেখতে হবে। তবে আমি যদি আমরা ক্যারিয়ার বেস্ট পারফরম্যান্স করতে পারি সেটা কম হবে না। সেটা আমাকে এসএ গেমসে ভালো করার অনুপ্রেরণা যোগাবে’ - বলছিলেন রিতু।
সর্বশেষ সাউথ এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রতিযোগি স্বর্ণ জিতেছিলেন ১.৭৩ মিটার লাফিয়ে। শ্রীলংকার প্রতিযোগি রৌপ্য পেয়েছিলেন ১.৬৯ মিটার লাফিয়ে।
আগামী গেমসে হয়তো এর চেয়েও বেশি উচ্চতায় লাফাবেন প্রতিযোগিরা। রিতুর এখন যতটা লাফাচ্ছেন সেটা আশা জাগানিয়াই। এক সময় ক্রিকেট খেলা রিতু এখন হাইজাম্পে আশার আলো জ্বালিয়েছেন।
দেশের দুই সেরা নারী হাইজাম্পারের একজন রিতু আক্তারের হওয়ার কথা ছিল ক্রিকেটার। কিভাবে তিনি ক্রিকেট বাদ দিয়ে হয়ে গেলেন অ্যাথলেট সে গল্পটা তার কাছেই শোনা যাক।
‘আমি স্কুল জীবনে হাইজাম্প, দৌড় দুইটাই খেলতাম। হাইজাম্পে সব জায়গায় প্রথম হতাম বলে এই খেলার প্রতি আমার আলাদা টান এসে যায়। একই সঙ্গে আমি ক্রিকেটও খেলেছি। এক বছর প্রথম বিভাগ খেললাম। এরপর ইচ্ছা হলো বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার। ট্রায়ালে অংশ নিলাম ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিকসে। দুটোতেই সুযোগ পেলাম। কিন্তু বিকেএসপি আমার উচ্চতা দেখে হাইজাম্পের জন্য বাছাই করলো। সেখানে আমি চারমাস ট্রেনিংও করলাম। কিন্তু নানা কারণে আমার বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া হয়নি। পরে এক বছর খেলাধুলায় একটা গ্যাপ পড়ে গেলো। ক্রিকেটও খেলা হচ্ছিল না, হাইজাম্পও না। শেষে সিদ্ধান্ত নেই হাইজাম্পই করবো। ২০১৭ সালে খুলনা জেলার হয়ে জাতীয় জুনিয়র অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে হাইজাম্পে অংশ নিয়ে ১.৪০ মিটার লাফিয়ে স্বর্ণ জিতেছিলাম’ - হাইজাম্পার হওয়ার গল্প বলছিলেন রিতু আক্তার।
বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সেবার হাইজাম্পে প্রথম হওয়ার পরই নজরে পড়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের কর্মকর্তাদের। ২-৩ মাস আনসারের হয়ে অনুশীলন করে ২০১৮ সালে জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকসে অংশ নিয়ে রিতু হাইজাম্পে ১.৪৫ মিটার লাফিয়ে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন।
ওই সময় তার খেলা দেখে পছন্দ করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসিয়ালরা এবং আর্মিতে খেলার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৬ মাস ট্রেনিংয়ের পর ২০১৯ সালের জুলাইয়ে তার চাকরি হয় ওই প্রতিষ্ঠানে।
সেনাবাহিনীর হয়ে প্রথম অংশগ্রহণে ফলটা ভালো হয়নি রিতুর। ২০১৯ সালে তিনি সেনাবাহিনীর জার্সিতে হাইজাম্পে অংশ নিয়ে পঞ্চম হয়েছিলেন ১.৫০ মিটার লাফিয়ে। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের পরের আসরেই বাজিমাত করেন রিতু। ১.৭০ মিটার লাফিয়ে প্রথম স্বর্ণটি জেতেন জাতীয় রেকর্ড গড়েই। বাংলাদেশ গেমসে ১.৬৯ মিটার জাম্প দিয়ে স্বর্ণ জিতেছিলেন। সর্বশেষ আসরে রিতুর জাতীয় রেকর্ড ভেঙ্গে ১.৭১ মিটারের নতুন রেকর্ড গড়েছেন রুমকী।
পাঁচ বছরের ক্যারিয়ারে এখনো আন্তর্জাতিক কোন আসরে খেলা হয়নি রিতুর। ইসলামী সলিডারিটি গেমস দিয়ে ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় যোগ করতে যাচ্ছেন গাইবান্ধার এই যুবতি। এই গেমসের অতীত রেকর্ড অনুযায়ী পদক জেতার সম্ভাবনা আছে তার। তবে রিতুর কথা, ‘আমি এখন যা লাফাই তার চেয়ে ভালো করার লক্ষ্যই থাকবে। তাতে যদি পদক আসে তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। সবার দোয়া চাই। দেখি দেশের জন্য কতটা ওপরে উঠতে পারি।’
কিছুদিন আগে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন হাইজাম্পের জন্য ভারতীয় কোচ নিয়োগ দিয়েছে। গোবিন্দরায় গাঁওকর নামের এই কোচের অধীনে হাইজাম্পের প্রশিক্ষণ চলছে। নতুন কোচ সম্পর্কে রিতু বলেছেন, ‘এক একজন কোচের একেক রকম টেকনিক থাকে। নতুন কোচ আসার পর তা থিওরি অনুসারে অনুশীলন করে উন্নতি হয়েছে।’
আরআই/আইএইচএস/