বগুড়ার শেরপুরে আমন মৌসুমের শুরুতেই সার নিয়ে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ডিলার ও ব্যবসায়ীরা সারের কৃত্রিম সংকট ও সরকারের দাম বাড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে আগের বরাদ্দের ৮০০ টাকার ইউরিয়া বিক্রি করছেন ১১০০ টাকায়। প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকা বেশি দিয়েই সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। তবে এই বাড়তি দাম দিয়ে সার কিনে আমন চাষ করে লাভবান হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
এদিকে, কৃষি বিভাগের তদারকি না থাকায় ডিলারদের নামে বরাদ্দের ইউরিয়া সার উত্তোলন করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। কমিশনের ভিত্তিতে তাদের কাছে লাইসেন্সও ভাড়া দিয়েছেন কোনো কোনো ডিলার। ফলে ডিলার-ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটই কৃষকদের পকেট কেটে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিস জানায়, কৃষিনির্ভর এই উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে ২১ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে বুধবার (৩ আগস্ট) পর্যন্ত ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চারা লাগানো হয়েছে। আর এই জমি চারা লাগানোর উপযোগী করতে প্রয়োজন এক হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার। সে অনুযায়ী জমিতে সার প্রয়োগও করেছেন কৃষকরা। কিন্তু কৃষি অফিসের হিসাবে দেখা গেলো উল্টো চিত্র। আগস্টের প্রথমদিন পর্যন্ত এই উপজেলায় সার বরাদ্দ ও উত্তোলন হয়েছে মাত্র ৪৫৮ মেট্রিক টন ইউরিয়া। তাহলে চাহিদার বাকি সার কৃষক কীভাবে সংগ্রহ করলেন এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই উপজেলায় বিসিআইসি অনুমোদিত সারের ডিলার রয়েছেন ১২ জন। আর বিআরডিসির ডিলার রয়েছেন ২১ জন। এছাড়া শতাধিক খুচরা সার ব্যবসায়ী রয়েছেন। সারের দাম বাড়ার আভাস পেয়েই কিছু ডিলার ও ব্যবসায়ী তাদের গুদামে ইউরিয়া সার মজুত করেন। সেইসঙ্গে বাজারে সার সংকটের গুজব ছড়িয়ে এবং সরকারের দাম বাড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন তারা।
কৃষক দুলাল হোসেন বলেন, মৌসুমের শুরুতেই ইউরিয়া সার নিয়ে কারসাজি শুরু হয়েছে। ডিলার ও ব্যবসায়ীদের দোকানে সার কিনতে গেলে বলেন সার নেই। কিন্তু বাড়তি টাকা দিলেই মিলছে সার। অথচ এসব সার আগের বরাদ্দের ও আগের দামেই কিনেছেন তারা। বিক্রির ক্ষেতে প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকা বেশি নিচ্ছেন।
মোজাম্মেল হক নামে আরেক কৃষক বলেন, এখন সারের খুবই প্রয়োজন। তাই বাধ্য হয়েই বেশি দামে সার কিনেছি। অথচ কৃষি বিভাগ নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আটশো টাকার ইউরিয়া সার বিক্রি হচ্ছে এগারশো টাকায়। এতে আমন চাষের খরচ বাড়বে। এই ফসল চাষ করে লাভবান হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি।
এদিকে, মঙ্গলবার (২ আগস্ট) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার কয়েকটি দোকানে সরেজমিন ঘুরে কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা মেলে।
দেখা যায়, গাড়ীদহ ইউনিয়নের দশমাইল এলাকায় সাথী এন্টারপ্রাইজের নামে বিসিআইসির একটি সারের ডিলার রয়েছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটির সত্ত্বাধিকারী শাহজাহান আলী এখন আর নিজে ব্যবসা করেন না। তাই গত কয়েকবছর ধরে তার লাইসেন্সটি ভাড়া দিয়েছেন। তার ভাগ্নে মোতালেব হোসেন সেটি ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন। তবে লাইসেন্সে দেওয়া শর্ত ভেঙে নির্দিষ্ট স্থানের (গাড়ীদহ বাজার) পরিবর্তে উপজেলার সীমান্তবর্তী জামুন্না বাজারে বিক্রয়কেন্দ্র খুলে বসেছেন ওই ব্যবসায়ী। এরপর থেকে নিয়মিত ওই লাইসেন্সে সরকারি বরাদ্দের ইউরিয়া সার উত্তোলন করে বিক্রি করছেন। কিন্তু জুন-জুলাইয়ে বরাদ্দের অবিক্রিত ইউরিয়া সার প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকা বেশি নিয়ে বিক্রি করছেন তিনি। বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে বেশি দামে সার বিক্রি করলেও ক্যাশ মেমোতে লেখা হচ্ছে আগের ৮০০ টাকায়। এই চিত্র শুধু তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, গোটা উপজেলা জুড়েই চলছে এই সার বাণিজ্য। সিংহভাগ ব্যবসায়ী বাড়তি দামে সার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ কৃষকদের।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহজাহান আলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে সাব-ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মোতালেব হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বেশি দামে সার বিক্রির প্রশ্নই আসে না। সরকার নির্ধারিত নিয়ম মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছি। এছাড়া কোনো অসঙ্গতি থাকলে কৃষি বিভাগ দেখবে, সেটি আপনাদের (সাংবাদিকদের) দেখার দায়িত্ব না বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি।
বেশি দামে সার বিক্রির কথা অস্বীকার করে আরেক সার ডিলার মীর্জা মালেক বলেন, ডিলার ও ব্যবসায়ীদের গুদামে তেমন মজুত নেই। আর যা আছে তা আগের দামেই বিক্রি করা হচ্ছে। তবে আগস্ট মাসের বরাদ্দের সার বর্তমান সরকার নির্ধারিত দামেই কিনতে হচ্ছে। তাই সেই দামেই বিক্রি করা হবে।
এ প্রসঙ্গে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আগের বরাদ্দের সার বাড়তি দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই। কোনো ডিলার-ব্যবসায়ী এ ধরনের কাজ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া কৃষকদের কাছ থেকে যেন বেশি দাম নিয়ে সার বিক্রি করতে না পারে এজন্য প্রত্যেক ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্র উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ময়নুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, এ ধরনের কোনো বিষয় জানা নেই। খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
এমআরআর/জিকেএস