দেশজুড়ে

ধার করা জনবলে চলছে কমিউনিটি ক্লিনিক

প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ নারায়ণগঞ্জ জেলার মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। এই উপজেলায় প্রায় ৪ লাখ মানুষের বসবাস। বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য ১০টি ইউনিয়নে সর্বমোট ৩৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে মানুষ টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবা পেয়ে থাকে।

মূলত একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি), একজন হেলথ অ্যাসিসটেন্ট (এইচএ) ও একজন ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিসটেন্ট (এফডাব্লিউএ) থাকে। কিন্তু কিছু কমিউনিটি ক্লিনিকে নেই স্বাস্থ্য সহকারী (এইচও) এবং পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডাব্লিউএ)। অর্থাৎ পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় স্বাস্থ্যসেবায় কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না সোনারগাঁয়ের ক্লিনিকগুলোতে।

যেসব কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে স্বাস্থ্য সহকারী নেই সেগুলো হলো সাদীপুর ইউনিয়নের ভারগাঁও, বরগাঁও, কাঁচপুর ইউনিয়নের কুতুবপুর, সনমান্দি ইউনিয়নের কাফাইয়াকান্দা, চেঙ্গাকান্দি, আমিনপুর ইউনিয়নের দরপত, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের পঞ্চবটি ও পিরোজপুর ইউনিয়নের তাতুয়াকান্দা কমিউনিটি ক্লিনিক।

যেসব কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে পরিবার কল্যাণ সহকারী নেই সেগুলো হলো- সাদীপুর ইউনিয়নের বরগাঁও, জামপুর ইউনিয়নের বস্তল, মোঘরাপাড়া ইউনিয়নের কাজিরগাঁও, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের পঞ্চবটি ও পিরোজপুর ইউনিয়নের মেঘনা শিল্পনগরী কমিউনিটি ক্লিনিক।

আবার এই ৩৪ কমিউনিটি ক্লিনিকের বারদী ইউনিয়নের নুনেরটেক কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার কল্যাণ সহকারী কেউই নেই। অর্থাৎ এই কমিউনিটি ক্লিনিকটিতে কোনো জনবলই নেই। অথচ এটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। সপ্তাহে একদিন অন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সিএইচসিপি এনে এখানে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় গ্রামবাসীর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়া সম্ভব হয় না।

নুনেরটেক গ্রামের বাসিন্দা মিনার রহমান জানান, শুরু থেকেই আমাদের ক্লিনিকের কোনো চিকিৎসক নেই। সপ্তাহে একদিন দরপত কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সোনারগাঁ পৌরসভা থেকে আমাদের এখানে এসে সেবা দেন। এর ফলে ঠিকমতো সেবা পাচ্ছি না। তাই মাঝেমধ্যে জরুরি চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন হলে আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। যা গ্রামবাসীর জন্য খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের পঞ্চবটি সিসিতে সেবা নিতে আসা সফুরা খাতুন নামে এক রোগী জানান, এখানে পরিবার কল্যাণ সহকারী না থাকায় আমরা নারীরা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছি না। যেকোনো টিকা নিতে এলে দীর্ঘক্ষণ সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এছাড়া নারীরা নানা স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সনমান্দি ইউনিয়নের চেঙ্গাকান্দি কমিউনিটি ক্লিনিকে গেলে ওই ক্লিনিকের সিএইচসিপি আনোয়ারুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন তার ক্লিনিকে প্রায় ৬০-৭০ জন রোগী আসে। স্বাস্থ্য সহকারী না থাকায় রোগীদের একা সেবা দিতে সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। আমার এখানে একজন স্বাস্থ্য সহকারী দরকার। তাহলে সেবা নিতে আসা কোনো রোগী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না।

দরপত কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপির দায়িত্বে থাকা আবু নাঈম জানান, দীর্ঘদিন ধরে আমার এই কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য সহকারী নেই। তাই আমার দুই দায়িত্ব একসাথে পালন করতে হয়। আবার সপ্তাহে একদিন বারদী ইউনিয়নের নুনেরটেক কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে সেবা দিতে হয়। এত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার হিমশিম খেতে হলেও আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি গ্রামবাসীকে সেবা দেওয়ার।

এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাবরিনা হক জানান, জনবল সংকটের বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিয়োগ দিলে আমাদের এ সমস্যা দূর হবে। শুধু আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে যে এ সমস্যা রয়েছে তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশের অনেকগুলো কমিউনিটি ক্লিনিকেই এ সমস্যা রয়েছে। তবে আমাদের দায়িত্ব যেকোনো সমস্যা সেন্ট্রালকে জানানো, আমরা তা গত অর্থবছরেই জানিয়েছি। হয়তো এ অর্থবছরে আমাদের এ সমস্যার অবসান ঘটবে।

আরেকটি আশার বিষয় হচ্ছে কিছুদিন আগে কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করেছেন। আমরা তখন আমাদের এ সমস্যাগুলো তার কাছে তুলে ধরেছি। আশা করি খুব শিগগিরই ভালো একটা রেজাল্ট পাবো।

নাারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান জানান, কিছু কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী না থাকায় রোগীদের সেবা দিতে একটু সমস্যা হচ্ছে। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছি। যেসব কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে আশা করি ডিসেম্বরের মধ্যেই নিয়োগ দেওয়া হবে।

রাশেদুল ইসলাম রাজু/এফএ/এমএস