প্রবাস

নিচতারা

মাগরিবের আজান শোনা যাচ্ছে। নিচতারা সব ঘরে ঘরে হারিকেন দিয়ে যাচ্ছে।

Advertisement

এই উপজেলার চেয়ারম্যান জমিদার পুত্র আসফাকউদ্দীন আহমেদ তার কাঁসার বদনা দিয়ে বারান্দায় বসেই ওযু সারলেন, বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে।

লাবণ্য খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে ঘরে বসে নানার ওযু করা দেখছে, তার নানা এই নিয়ে দুইবার সেরা চেয়ারম্যানের পদক পেয়েছেন, তার যথেষ্ট নাম ডাক, জমিদার পুত্র বলে নয়। নিজের ব্যবহার ও ন্যায়নীতির জন্যই তার সুখ্যাতি।

মাত্র এক বদনা পানি দিয়ে ওযু শেষ করলো নানা, কিন্তু কিভাবে? লাবণ্যের তো মিনিমাম তিন বদনা লাগে! এরপর ভালো করে দেখতে হবে, সে মনে মনে নিজের ওপর খুবই হতাশ হলো এত পানি সে অপচয় করে।

Advertisement

বারান্দার এক পাশে কাপড় শুকানোর তার থেকে গামছা টেনে নিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আসফাকউদ্দীন লাবণ্যকে বললো, আজ বাড়িতে কি রান্না হয়েছে রে। দুনিয়ার খিদে লাগছে। এতো ব্যস্ত ছিলাম দুপুরে তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। হোটেল থেকে খাবার এনেছিলো, একেবারে অখাদ্য, গলা নিয়ে নামেনি। তোর নানিকে বল খাওয়া রেডি করতে, নামাজ পড়া হলে একসাথে খাবো।

লাবণ্য আর অরণ্য ভাত খেতে বসেছে খাওয়ার ঘরে, নানার দুই পাশে বসেছে দুইজন। ছোট খালা নিতু ও এসেছে ওদের আসা উপলক্ষে, মেঝো খালা মিতা ঢাকায় থাকে। বাড়ির বড় ছেলে রায়হান শহরের বাসায় থাকে, ওখানেই তার ব্যবসা। আসফাকউদ্দীন আর আখতারুন্নেচ্ছার তিন মেয়ে, দুই ছেলে। ছোট ছেলে ছাড়া সবাই বিয়ে করেছে।

আখতারুন্নেচ্ছা সবার খাওয়া তদারকি করছে। প্লেটে এটা ওটা তুলে দিচ্ছে। আজকের মেনু, ঘরে পালা মুরগির ঝোল নতুন আলু দিয়ে, ডিম ভুনা, পুঁইশাক দিয়ে পুঁটি মাছের চর্চড়ী, লাল হাগরাই আলু ভর্তা আর ডাল। আসফাকউদ্দীন বলে উঠলেন রাশেদকে দেখছি না কেন, ফেরেনি?

আখতারুন্নেচ্ছা বললো অনেক আগেই ফিরছে, সঙ্গে এক বন্ধুকে নিয়ে। আপনাদের খাওয়া হলে ওদের খেতে ডাকবো। নিচতারা, আরও একটা হারিকেন খাওয়ার ঘরে দিয়ে যা। শাক দিয়ে ছোট মাছ খাচ্ছে লাবণ্য। আবার গলায় আটকে যদি।

Advertisement

লাবণ্য বলে উঠলো, আমি ঠিক আছে নানু। বাইরে বেশ দমকা হাওয়া। শ্রাবন মাসের হাওয়া। মেঘ ডাকছে। নিচতারা, ধানগুলো গোলা ঘরে তুলছিলো, রাতে মনে হয় পানি আসবি, আখতারুন্নেচ্ছা বললেন, অরণ্য বলে উঠলো জানো নানা, ছোট মামার বন্ধু না ম্যাজিক দেখাতে পারে, রাতে খাওয়ার পর দেখাবে।

এই সময়ে লাবণ্যের মা রিতা ঢুকলো। ঢুকেই অরণ্যকে বললো তুমি ডিম আর মুরগী দিয়ে খাও। ছোট মাছ বাছতে পারবে না, খাওয়া লাগবে না। লাবণ্য বেশি করে শাক খাও, সারাদিন বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকো, দুইদিন পর চোখে কিছুই দেখবা না।

নিতু বলে উঠলো বড়পা, এটা তোর বাড়ি না, সারাক্ষণ উপদেশ দিবা না। আমরা দেখছি তো। অরণ্য ক্লাস সিক্সে। এখনো যদি ছোটমাছ খাওয়া না শেখে তো কবে শিখবে?

রাশেদ এসে ঢুকলো খাওয়ার ঘরে। আম্মা, আজকের রাতটা যদি আমার বন্ধু থেকে যায়। কোনো সমস্যা হবে? রিতা প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো, তোর বন্ধু থাকবে মানে? লঙ্গরখানা পাইছিস? এর আগে একজনকে এনেছিলি, কাছারি ঘরে দুইমাস পড়েছিলো, এখন আবার।

রিতাকে থামিয়ে দিয়ে রাশেদ বলে উঠলো আহা। ও কাল সকালে চলে যাবে তো, রাতে ম্যাজিক ভালো জমে। তাছাড়া নিচতারার সঙ্গে কথা বলতে চায়, এজন্য। নিচতারার সাথে! কেন?

সাথে জ্বীন আছে, তাই। ও আগে জ্বীনে ধরা কাউকে দেখেনি, তাই কথা বলতে চায়। আসফাকউদ্দীন গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো, নিচতারার সঙ্গে জ্বীন আছে, এটা তোমার বন্ধু জানে কিভাবে রাশেদ?

রাশেদ হাত দিয়ে মাথার পেছনের দিকটা চুলকাতে চুলকাতে বললো, আমি বলেছি আব্বা। আসফাকউদ্দীন বিস্ময় ও হতাশা জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার বয়স কত?

জ্বী আব্বা, সাড়ে বিশ। (খাওয়ার মাঝেই লাবণ্য ফিক করে হেসে দিলো)

তুমি কি মনে করছো তোমার আচরণ বিশ বছর বয়সীদের মত? একটা বাড়িতে অনেকেই থাকে। অনেক কিছু হয়। সবকিছু বাইরের মানুষকে বলতে হয় না, কিছু জিনিস নিজের মধ্যে রাখতে হয়। নিচতারা এই বাড়িতে কাজ করে। আমি চাই না তাকে নিয়ে বাইরের মানুষ কথা বলুক। সে যতই কাজের লোক হোক, আমাদের বাড়ির একটা সম্মান আছে।

বৈঠকখানার ঘরে তোমার বন্ধুর থাকার ব্যবস্থা করো। তার সাথে তুমিও ওখানেই থাকবে আজকে। রাতে নিজে দরজার ছিটকানি লাগিয়ে ঘুমাবে। আর সকালে তোমার আম্মা ডাক পাঠানোর পর তোমার বন্ধুকে নিয়ে নাস্তা করে তারপরে তাকে বিদায় দেবে।

আসফাকউদ্দীন খাওয়া শেষ করে উঠে হাত ধুয়ে ফেললেন। আখতারুন্নেচ্ছাবলে উঠলো আপনি তো কিছুই খেলেন না, গরুর দুধ আছে, গাছের কলা আছে, দুধ কলা দিয়ে ভাত দেই?

নাহ, আমি আর কিছুই খাবো না, অনেক খেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।

নিচতারা পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলো, আসফাকউদ্দীন চলে যাওয়ার পর বললো চাচি আজকের কাজকাম তো শ্যাস, আমি যাই?তোর খাবার খেয়ে যা, নাকি নিয়ে যাবি?

অরণ্য বলে উঠলো, নিচতারা আজকে তুমি থেকে যাও, ম্যাজিক হবে রাতে। শ্যামল মামা ম্যাজিক জানে। হ্যাঁরে নিচতারা, তু্ই আজ থেকে যা। শ্যামল তোর সাথে কথা বলতে চায়, রাশেদ বললো।

‘আমার মা চিন্তা করবি ভাইজান, আমার বাপের শরিলডা ভালো লয়, জানেন তো সবই’। আমি রাতে দিয়ে আসবোনে তোকে, আমার আট ব্যাটারির টর্চ আছে।

আখতারুন্নেচ্ছা বললো, নিচতারা সেই সকাল থেকে কাজ করে, তাকে ছেড়ে দেওয়াই ভালো রাশেদ। সবসময়ে ঝামেলা করবি না।রিতা বলে উঠলো তোমরাই তো ওকে লাই দিয়ে মাথায় তুলছো, দেখবা সামনে আরো কত জ্বালায়।

দুলাভাই ভাই কবে আসবে রে? আমাদের উপজেলার পক্ষ থেকে তাকে একটা শান্তি পুরস্কার দেওয়া উচিত। তোর মতো ছিদ্রান্বেষীকে নিয়ে সংসার করছে। দুলাভাই আমাদের কি বাঁচান টাই না বাচাইছে। লাবণ্য আর অরণ্যর জন্য আমার মায়া লাগে। কি কষ্ট করেই না বড় হচ্ছে বাচ্চা দুইটা।

আম্মা দেখছো, দিবো কিন্তু একটা থাপ্পড়। নিতু মুখ চাপা দিয়ে হাসতে লাগলো। নিতুর এখনো ছেলে মেয়ে হয়নি, মাত্র বছর দুয়েক হলো বিয়ে হয়েছে।

লাবণ্য আর অরণ্য তার আসফাকউদ্দীনের গা ঘেঁষে বসে আছে তার শোবার ঘরে, বিশাল বড় ঘর, অনেক উঁচু সিলিং, ঘরের সব আসবাব বেশ বনেদি, হুকা সাজিয়ে দিয়ে গেলো পিন্টু, আসফাকউদ্দীনের সহকারী। আসফাকউদ্দীন তার সেগুন কাঠের কাজ করা পালঙ্কে তিনটে বালিশ নিয়ে আধাশোয়া হয়ে হুকায় সবে একটা টান দিয়েছে।

এই সময় লাবণ্য বললো আচ্ছা নানা, তোমার বাবা, আম্মুর দাদা জমিদার সাহেব কেমন মানুষ ছিলেন? পিন্টু পেছনে দাঁড়িয়ে বিশাল পাখা দিয়ে বাতাস করছে।

আসফাকউদ্দীন ভেতরে কিছুটা অবাক হলেও মুখে হাসি টেনে বললেন, কেনরে তু্ই হঠাৎ আমার বাবার খোঁজ করছিস কেন? আমাকে পছন্দ হয় না? (মনে মনে ভাবছেন তার নাতনি এত বুদ্ধিমতি। ঠিক যেন তার মা, অনেক বুঝে সুঝে কথা বলতে হয়)

নাহ, এমনিতেই, কৌতূহল থেকে। জানতে ইচ্ছে করতে পারে না। ফ্যামিলির ইতিহাস জানতে ভালো লাগে।

আমার আব্বাকে তো আমি ভালোই বলবো, আমি কি খারাপ বলবো? সে কেমন ছিল জানতে হলে তার শত্রুকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। তাহলে না আসল খবর পাবি। আমি যতদূর মনে করতে পারি, তার কোনো শত্রুই ছিল না। সে খুবই হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। প্রজাদের জন্য অনেক করেছেন।

আর তোমার মা?

আমার মা আব্বার তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন। এত সুন্দরী আর এত বুদ্ধিমান মেয়ে তল্লাটে ছিল না। তু্ই আমার আম্মার রূপ অল্প কিছু পাইছিস।

অল্প কিছু!

লাবণ্য চেহারা বিষণ্ণ করে ফেললো,

আচ্ছা বড় নানা এতগুলো বিয়ে করলেন কেন?

জমিদার ছিলেন, অনেক টাকা ছিল, তাই?

না রে সেজন্য না।

উনার প্রথম স্ত্রী বিয়ের এক বছরের মাথায় মারা যায় ওলাওঠায়। তখনকার দিনে চিকিৎসা ব্যবস্থা এত ভালো ছিল না। আব্বা অনেক চেষ্টা করেছিলেন বাঁচাতে।

এর বছর পর উঁনি আবার বিবাহ করেন, সেই স্ত্রী সন্তান হতে গিয়ে সন্তানসহ মারা যায়। আব্বাজান খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন।

এর কিছুদিন পর নিকটাত্মীয়রা মিলে তাকে তৃতীয় বিবাহ করান। যিনি আমার আম্মা ছিলেন। আব্বা প্রথমে রাজি ছিলেন না, মেয়ে দেখার পর না করতে পারেননি। কারোরই পারার কথা ও না। সম্মোহিত করে ফেলার মত সুন্দরী ছিলো, চোখ দিয়ে কথা বলতে পারতো।

উনি কি চতুর্থ বিবাহ করেছিলেন অরণ্য জিজ্ঞাসা করলো?

নাহ, উনি তৃতীয় স্ত্রী ও তিন সন্তান রেখে ইন্তেকাল করেন।

লাবণ্য বললো, আমি তোমার মায়ের অল্প রূপ পেয়েছি বুঝলাম। কিন্তু গুন, বুদ্ধি?

আসফাকউদ্দীন হুকা টানতে টানতে হেসে ফেললেন, তু্ই আমার মায়ের রূপের অর্ধেক পেয়েছিস, গুনের বিষয়টা এখনও স্পষ্ট না। কে জানে তু্ই তাকেও ছাড়িয়ে যাবি কিনা। নাকি ঐটাও অর্ধেক! বলে তিনি ঘর কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন।

এই গল্পের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তবে কারো সঙ্গে মিলানোর চেষ্টা না করাই শ্রেয়।]

এমআরএম/এমএস