কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনারসহ বিভিন্ন জেলায় ডাকাতি ও হত্যা মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও ভাড়াটে খুনি আক্কাস বাহিনীর প্রধান আক্কাস মিয়াকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। এক ডজন মামলার আসামি আক্কাস গ্রেফতার এড়াতে ইট ভাটার শ্রমিক পরিচয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। গ্রেফতারের মাধ্যমে আক্কাসের দীর্ঘ ছয় বছরের আত্মগোপনের জীবন শেষ হলো। বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আক্কাসের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার কামারগাঁও এলাকায়।
এদিন রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পলাতক পেশাদার খুনি ও ডাকাত আক্কাস বাহিনীর প্রধান আক্কাস মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা, ডাকাতি, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধে মামলা রয়েছে।
আক্কাস মিয়াকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, খুন ও ডাকাতি করা তার পেশা। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেত্রকোনার খালীয়াজুড়িঁ উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়ন আদমপুর গ্রামের বাসিন্দা মনোরঞ্জন সরকারের বাড়ির দেয়াল ভেঙে প্রবেশ করে আক্কাস বাহিনী। তারা পুরুষ সদস্যদের হাত-পা বেঁধে স্বর্ণা অলংকার, নগদ টাকা ডাকাতি করে। এসময় মনোরঞ্জন সরকারের ছেলে বাধা দিলে তাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। খুন ও ডাকাতির ঘটনার মামলায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন আক্কাস।
‘আক্কাসের বাহিনী হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ এলাকায় অর্ধ-শতাধিক বাড়িতে ডাকাতি করে। বহু ডাকাতির ঘটনায় কেউ চিহ্নিত হয়নি। এছাড়া অধিকাংশ ভুক্তভোগী কোনো ধরনের অভিযোগ দেননি। গ্রেফতার আক্কাসের বিরুদ্ধে ডাকাতি, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে সাতটি মামলা রয়েছে।’
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এছাড়া ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে আক্কাস নিজ উপজেলায় বাহিনীসহ ভাড়ায় মারামারি করতে যান। মারামারিতে দুই গ্রুপের তিনজন মারা যায়। আক্কাস নিহতদের মরদেহ ধান খেতে মাটি চাপা দিয়ে রাখেন। ২০১৪ সালেও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায়ও মারামারি করতে যায়। সেখানে ১০ জন আহত হন।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, খুন ও ডাকাতি ছাড়াও এলাকায় ভূমি দখল, জলমহল দখল, ভাড়ায় মারামারি ও লুটপাট করতেন আক্কাস। আক্কাস বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ জন। ডাকাত দলের সদস্যদের নিয়ে তিনি হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোনা এলাকায় ডাকাতি করতেন। ডাকাতির কাজে বাধা দিলে হত্যা করা হতো। ২০০৬ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত খুন, ডাকাতি, খুনসহ ডাকাতি, চুরি, মারামারি, লুটপাট, দাঙ্গা-হামলাসহ ১২টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে শাল্লা থানায় একটি সাজা ওয়ারেন্টসহ মোট ছয়টি ওয়ারেন্ট রয়েছে। হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোনা এলাকায় আক্কাস বাহিনী ছিল একটি আতঙ্কের নাম।
তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে সুনামগঞ্জ থেকে পালিয়ে রাজধানীতে এসে ছদ্মনামে বসবাস করতে শুরু করেন আক্কাস। রাজধানীতে আসার পর একাধিকবার তিনি তার বাসস্থান ও পেশা পরিবর্তন করলেও কখনোই আক্কাস তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেননি। জীবিকার তাগিদে তিনি প্রথমে রিকশাচালক, বাসের হেলপার, কিছুদিন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, রাজধানীর বাড্ডা, কেরানীগঞ্জ, মিরপুর এলাকায় বহুবার তার বাসস্থান পরিবর্তন করে। এক এলাকায় বেশিদিন থাকতেন না তিনি। একপর্যায়ে আক্কাস রাজধানীতে একটি ডাকাত চক্র গড়ে তোলেন। প্রথমে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যানবাহনে ডাকাতির চেষ্টা করেন। তারপর তিনি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসায় ডাকাতি শুরু করেন। এসব ডাকাতির ঘটনায় আক্কাস ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও তার দলের সদস্যরা গ্রেফতার হয়। পরে ডাকাতি ছেড়ে মাছের ব্যবসা শুরু করেন আক্কাস। ২০১৯ সালে খুনসহ ডাকাতি মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হওয়ার পর কেরানীগঞ্জ এলাকায় ইট ভাটায় স্ত্রীসহ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মহিউদ্দিন বলেন, আক্কাস মিয়া তার ডাকাতি জীবনে কতগুলো হত্যা ও লুটপাট করেছে তার সঠিক তথ্য কেউ জানে না। তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত ১২টি মামলা ও ৬টি ওয়ারেন্ট পাওয়া গেছে। আরও মামলার তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ঢাকায় তার গঠন করা ডাকাত দলের সদস্যরা আর তার সঙ্গে নেই। তবে তাদের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
টিটি/আরএডি/জেআইএম