জাতীয়

‌‘আগে মানুষের কাছে যেতাম, এখন মানুষই আমার কাছে আসবে’

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণী লাম নু খাই মার্মা। শিক্ষার আলো ছিল তার থেকে অনেক দূরে। বলতে গেলে সমাজের পিছিয়েপড়াদের মধ্যে তিনিও একজন। তবে পড়ালেখা নয়, বাবা-মা, ভাই-বোনকে নিয়ে সংসার চালানো নিয়েই ছিল তার যত চিন্তা। পড়ালেখার সুযোগ সেভাবে না পেয়ে শিক্ষাগ্রহণ করতে না পারলেও স্বাবলম্বী হয়েছেন লাম নু খাই মার্মা।

সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়া এই তরুণী জাগো নিউজকে জানান, নানাভাবে পিছিয়ে থাকলেও র‍্যাব থেকে পাওয়া এ প্রশিক্ষণ জীবনের আলো ফিরিয়ে এনেছে। সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ তাকে সাবলম্বী করেছে। তিনি এখন সুন্দর ও স্বনির্ভর জীবনযাপন করতে চান।

শুধু লাম নু খাই মার্মা নয়, এমন ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৩৬ জনকে আলোর পথে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করে র‍্যাব। যাদের অনেকেই বেকার, কেউ অর্ধশিক্ষিত, বেঁচে থাকার অবলম্বনহীন, কেউ আবার ছিলেন অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকিতেও।

‘অপরাধকে না বলুন’ স্লোগান ধারণ করে অপরাধ প্রতিরোধবিষয়ক স্ট্র্যাটেজির আওতায় নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এলিট ফোর্স র‍্যাপিড আ্যকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

নতুন এ কর্মসূচি ‘নবজাগরণ’-এর আওতায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বা ঝুঁকিতে থাকা ৩৬ তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীকে সাবলম্বী করার উদ্যোগ গ্রহণ করে র‍্যাব।

তাদের মধ্যে ছয়জনকে হোটেল সার্ভিস বয়, পাঁচজনকে সার্ফিং, পাঁচজনকে ট্যুরিস্ট গাইড প্রশিক্ষণ, পাঁচজনকে ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণ, ১০ জনকে সেলাই মেশিন প্রশিক্ষণ এবং পাঁচজনকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দেয় র‍্যাব। এরই মধ্যে তাদের অনেকেই চাকরি পেয়েছেন, কেউ পেয়েছেন স্বাবলস্বী হওয়ার সুযোগ।

সাবরিনা ইয়াসমিন সোনালী কক্সবাজার সিটি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়ছেন। পাশাপাশি কাজ করতেন ফ্লাই ডাইন হোটেলে। কক্সবাজার সুগন্ধা সৈকতপাড়ের এ তরুণীর চাকরি হয়েছে সায়মন লং বিচ হোটেলে। এই সুযোগ তৈরি হয়েছে হাউজ কিপিং প্রশিক্ষণ নেওয়ার কারণে। আর সেটি করে দিয়েছে র‍্যাব। সোনালী এখন শুধু পড়াশোনার খরচই নয়, পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগও পেয়েছেন।

রামু দক্ষিণ মিঠাছরির সেলিনা আক্তার পড়াশোনা করছেন কক্সবাজারের মহিলা কলেজে। বাবা আব্দুল মা’বুদ দিনমজুর। সেলিনা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান। এজন্য দরকার ছিল স্বাবলম্বী হওয়া, সেই সুযোগটি পেয়েই সেলাই মেশিনের কাজ শিখেছেন সেলিনা। এখন শুধু নিজের বাড়িতে থেকেই নারীদের জামা-কাপড় তৈরি করা শুরু করেছেন সেলিনা।

সেলিনা জাগো নিউজকে বলেন, আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই, স্বাবলম্বী হওয়ার পথে র‍্যাবকে পাশে পেয়েছি। আগে আমি মানুষের কাছে যেতাম, এখন মানুষই আমার কাছে আসবে। শুধু নিজের খরচ নয়, পরিবারের পাশে থাকার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে সেটা আমার জন্য বিশেষ কিছু। এজন্য র‍্যাবকে ধন্যবাদ জানান সেলিনা।

প্রশিক্ষণ নিয়েছেন যারা শুধু তারাই নয় তাদের অভিভাবকরাও র‍্যাবের এ কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন।

কক্সবাজার হাজিপাড়া পাওয়ার হাউজের বাসিন্দা হেলাল দেওয়ান জাগো নিউজকে জানান, তাদের দুই বোন, তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট নুরুল আমিন মুন্না। কিছুই করতেন না। মাদকপ্রবণ এলাকা হওয়ায় খুব আতঙ্কে থাকতেন। কখন কী করে বসেন। তবে র‌্যাবের দেওয়া গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ তার ভাইকে সুযোগ করে দিয়েছে কাজ করার।

আট বছর ধরে বিল্লাল হোসেন লং বিচ হোটেলের হাউজ কিপিংয়ের কাজ করছেন। বিল্লাল জাগো নিউজকে বলেন, নিজেও বেকার ছিলাম। বেকারত্ব ঘোচাতে গাজীপুরে কাপাসিয়া থেকে ১০ বছর আগে কক্সবাজারে এসেছি। লং বিচ হোটেলে আট বছর ধরে হাউজ কিপিং হিসেবে কাজ করছি। বেকারত্ব ঘোচানোর র‌্যাবের এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়।

কক্সবাজারের প্রাণকেন্দ্র কলাতলীতে বাসা হলেও পড়াশোনার সুযোগ মেলেনি সৈয়দ হোসেনের। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা সৈয়দ পেয়েছেন আলোর দিশা৷

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, পড়াশোনা শিখিনি, কিছু একটা তো করতে হবে। সি সার্ফিং এর প্রতি ঝোঁক ছিল। কিন্তু শেখার সুযোগ পাইনি। র‍্যাবের সহযোগিতায় সি সার্ফিং শিখেছি। আমি এখন নিজেই সার্ফিং ক্লাব করবো, এখন শেখাতেও পারবো।

‘নবজাগরণ: অপরাধকে না বলুন’ শীর্ষক কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে ৩৬ প্রশিক্ষণার্থীর হাতে সনদপত্র তুলে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল পৌনে ৬টায় লং বিচ হোটেলের বলরুমে এ সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে র‍্যাব।

অনুষ্ঠানে র‍্যাবের নবজাগরণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যেসব এলাকা ভারনারেবল, জনসংখ্যা অতিরিক্ত এবং কর্মসংস্থান কম সেখানে মানুষগুলোকে টার্গেট করেছেন র‍্যাব। তারা অপরাধে জড়িয়ে যেতে পারে, সেজন্য তাদের আলোর পথ দেখাচ্ছে র‍্যাব। এটা নিঃসন্দেহে একটা সাহসী উদ্যোগ। সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো আলোকিত বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে একসঙ্গে বেঁচে থাকবে, এটা আমরা চাই।

মন্ত্রী বলেন, আজ কক্সবাজারে নির্দিষ্ট করে কাজ করছে র‍্যাব। এমন একটি জায়গা এই কাজটি করছে যেখানে সবাই একবার হলেও এই কক্সবাজারে আসতে চায়। ট্যুরিস্ট পুলিশসহ পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, আনসার বাহিনী রয়েছে এখানে। সবারই একটাই উদ্দেশ্য, শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিটা যেন ধরে রাখতে পারি।

আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, অপরাধী হিসেবে কেউ জন্ম নেয় না। মূলত তাকে সমাজ, পরিবেশ ও পরিস্থিতি তাকে অপরাধে পরিণত করে। শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একজন মানুষকে যে সমস্ত সামাজিক পরিস্থিতি বাধ্য করে, সেগুলোকে যদি আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তাহলে সমাজে ধীরে ধীরে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব। আমরা চেষ্টা করতে পারি শূন্য অপরাধ হয় এমন সমাজ কায়েম করার।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসএসসি, এইচএসসি ও বিএ পাস দিয়ে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করা হয় না। এদের মধ্যে হয়তো এক শ্রেণির অংশ সিভিল সার্ভিসের অফিসার হবে, একটি অংশ হবে কেরানি আর বাকি অংশ হবে বেকার। এজন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। র‍্যাব আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে কীভাবে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়।

র‍্যাব মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেন, কক্সবাজার র‍্যাব-১৫ এর ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ৩৬ জন প্রশিক্ষণার্থীকে সেলাই, ড্রাইভিং, টুরিস্ট গাইড, ফটোগ্রাফি, রেস্টুরেন্ট সার্ভিস এবং সার্ফিং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ চলাকালীন প্রশিক্ষণার্থীদের আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে এবং প্রশিক্ষণ শেষে অনেককে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।

পাশাপাশি কর্মসংস্থানের বিভিন্ন উপকরণও দেওয়া হবে। আমি আশা করি, এখানে যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হতে নিজে বিরত থাকবেন এবং অন্যদেরও বিরত রাখবেন। যারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত তারা সে পথ থেকে ফিরে এসে আপনাদের দেখে স্বাবলম্বী হতে উৎসাহ পাবেন।

র‍্যাব মহাপরিচালক মামুন বলেন, অপরাধপ্রবণ লোকদের চিহ্নিত করে নবজাগরণ কর্মসূচির আওতায় সুন্দর জীবন গঠনের পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে অপরাধে জড়াতে নিরুৎসাহিত করা। আর এটা কার্যকর করে সমাজে অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

কক্সবাজারের ডিসি মো. মামুনুর রশিদ বলেন, র‍্যাবের অন্য কার্যক্রমের ন্যায় এ কার্যক্রমের প্রতিফলন আমরা এরই মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। কক্সবাজার নানা দিক থেকে অপরাধপ্রবণ এলাকা। আমরা এরই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার জেলা অপরাধমুক্তির পথে অনেকখানি এগিয়ে যাবো।

টিটি/ইএ