বইয়ের ফ্ল্যাপে ‘নাচের শব্দ’ কবিতাটি পুরোপুরি তুলে ধরা হয়েছে- ‘জোড়া শালিক নাচে যখনখয়েরি হলুদ শব্দ হয়মানুষ পাখি মারে যখনলাল গোলাপি শব্দ হয়মানুষ মানুষ মারে যখন তখন নাচের কোন সময়?’
রূপকধর্মী এই কবিতার অর্থ পাঠকভেদে আলাদা হবে। আর সেখানেই কবিতার সার্থকতা। আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের কাছে এটা একটা বর্ণনামাত্র। কিন্তু আসলেই কি তাই? জোড়া শালিক আমাদের লোকাচারে সুসময়ের প্রতীক, জীবনের ছন্দের প্রতীক। তাই হয়তোবা খয়েরি হলুদ শব্দ দ্বারা সূর্যের রঙের কথা বলা হয়েছে।
কারণ সূর্যের আলোই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের উৎস। আবার মানুষ যখন পাখি মারবে তখন অবশ্যই রক্ত ঝরবে তাই কি তখন লাল গোলাপি শব্দ হয়? এরপর লেখক প্রশ্ন তুলেছেন একজন মানুষ যখন অন্য মানুষকে মারে তখন কি ধরনের শব্দ হয়? তখনও কি নাচের সময়? না কি শোকের সময়।
পুরোপুরি ঘন কালো বর্ণের মলাটের বইয়ের ওপর ধ্রুব এষের নাচের শব্দের চিত্রগুলোকে কেন জানি নৃত্যরত শব্দের সারি মনে হয়। আর বইয়ের লেখক পরিচিতিতে আছে শুধুমাত্র লেখিকার একটা সাদাকালো ছবি। ছবির নিচে সাদা কালিতে লেখকের নাম আর জন্ম, মৃত্যুর সাল লেখা। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সেটাকে মনে হয় কালো সাগরে ভেসে বেড়ানো, দ্যুতি ছড়ানো একজন মানুষের অবয়ব।
এই সাদাকালো ছবিতেই লেখকের আলোকিত চেহারার অকৃত্রিম সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। পাঠক এই বই পাঠ করতে যেয়ে বারবার লেখিকার এই ছবির দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হবেন। কারণ লেখক ভাবনার সৌকর্য এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যের এক বিরল সংমিশ্রণ।‘নাচের শব্দ’ সুরাইয়া খানমের একমাত্র প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ।
বইটি চার ফর্মার, প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালের জুনে। দ্বিতীয় মুদ্রণ হয় ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে, চারুলিপি প্রকাশন থেকে। উৎসর্গ করা হয় কবি আবুল হাসানকে। কাব্যগ্রন্থটিতে সংকলিত ৫২টি কবিতা। কলেবরে কোনো কোনো কবিতা কয়েক পর্বের আবার কোনটা মাত্র দুই লাইনের। কিন্তু প্রত্যেকটা কবিতার বিষয়বস্তুতেই পাঠকের জন্য ভাবনার খোরাক আছে। এমনকি দু লাইনের একটা কবিতার মধ্যেও লেখকের ভাবনার গভীরতার ছাপ স্পষ্ট। কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে এসেছে প্রেম, দ্রোহ, মধ্যবিত্তের জীবনযাপন, দৈনন্দিন বিষয়াদি, ইহলোক এবং দেবলোক, পূর্বসূরির কাছে চাওয়া, আত্মনুসন্ধান, কিসে নারী জীবনের পূর্ণতাসহ আরও অনেক খুঁটিনাটি বিষয়। তাই পড়তে গেলে একঘেঁয়ে লাগে না বরং বিষয়বস্তুর ভিন্নতা পাঠকে আনন্দায়ক করে। আর কবিতার জীবনবোধ উপলব্ধি করতে একই কবিতা বেশ কয়েকবার পাঠ করতে হয়ে। বইয়ের প্রথম কবিতার নাম ‘ভ্রস্টলগ্নে ম্যানিফেস্টো’ এই কবিতার মাধ্যমে শুরুতেই কবি উদাত্ত কণ্ঠে জানিয়ে দিচ্ছেন তার ঘোষণা। তিনি ওই সময়টাকে ভ্রষ্টলগ্নের সঙ্গে তুলনা করে সবাইকে অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় তার কবিতা শুনতে বলছেন। লেখকের ভাষায়-
‘এই গাছ, কবিতা শোন আমারশোন পাথর, কবিতা শোন দেওয়াল,এই শুয়োরের বাচ্চা, শুনে যা আমার কিস্যাকুকুরের ছানা শোন কবিতা আমার।…………………………লগ্ন যাচ্ছে;ভ্রষ্ট লগ্নে শুনে যা আবারঅমল শব্দের ধ্বনি, প্রানের টংকার।উদ্ধারের ইস্টিমার ছাড়ছে ঐশোনছাড়পত্র আমারই কবিতা।’
দ্বিতীয় কবিতায় শব্দকে সঙ্গী করে নিয়েছেন। বলছেন শব্দের মাধ্যমেই তিনি তার ভাবনাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে চান। শব্দের মাধ্যমেই তিনি সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান।
কবির ভাষায়- ‘শব্দের বাণ মারছি আমি, সহ্য থাকে বুক পেতে নে।শব্দ গ্রেনেড ফাটছে মাথায়, মেধায় মেধায় ছড়াস তাকে। এই যে আমার শব্দের ফুল তোদের হৃদয় পাত্রে ফোটা।ভাইফোঁটা নে ভাইরা আমার, শব্দ ফোটা।................................................শব্দ ভেলায় জ্বালিয়ে আছি, পায়ের তলায় তরঙ্গ তাল।শব্দ সকাল জাগবে আবার মুছবে মড়ক মারী আকাল।’
ভিন্ন দৃষ্টি কবিতায় কবি জানাচ্ছেন কীভাবে তার ভাবনা এবং জীবনবোধ ভিন্নভাবে বাইরের লোকের কাছে ধরা দেয়। আসলে কবিতাও তো এমন। কবি লেখেন একটা ভাবনা থেকে। আবার আমরা যখন পড়ি তখন ভিন্ন অর্থ করি। কবির এবং পাঠকের ভাবনা একবিন্দুতে এসে মিলতেও পারে আবার নাও মিলতে পারে।
কবির ভাষায়- ‘নন্দিত সমাজ শুধু শাসনের চাবুক শাসায় লোভের থালায় তোলে সন্তমুণ্ডু ঘাগরা দুলিয়েদেখে আমি বিরাপের বিদ্ধ কান্না তুলিতোমরা শুধু দেখলে রিক্ততা?’
কবি নিজের চিন্তা ভাবনার পাশাপাশি শরীর বিষয়েও লিখেছেন অত্যন্ত খোলামেলাভাবে। কখনও বা হিসাব কষছেন হাতে কি আছে? আবার কখনও নিজের দহনে দুঃখিত হতে বারণ করছেন। শুশ্রূষাগার কবিতায় লিখেছেন- ‘এই দেখো শরীর আমারঃএ যেন তোমার শান্ত শুদ্ধি নিকেতন, এ যেন বিশ্রামাগার হে পথিক ক্লান্ত পথচারী বসো তুমি শীতলপাটির বুকেগোলাপ জলের ঝারি, কাঁঠাল ছায়ায়!’
প্রশ্ন কবিতায় লিখেছেন- ‘মথ পোকা এসে গায়ে বসে কেন,আমি কি রেশম?’
আত্মলীনাতে লিখেছেন- ‘সত্যের গোপন ঘ্রাণ রাখো বক্ষেরাখো ঐ আত্মার অনল উষ্ণ তেজস্বী মনন-মনস্বীতা,নিজের দহনে এত দুঃখিত হয়ো না!’
হিসাব কবিতায় প্রশ্ন করেছেন- ‘হাতে কী আছে?বয়স, প্রেম, অর্থ, জ্ঞান, রূপ, প্রতাপ, দুঃখ না কি মৃত্যু?’
দহন কবিতায় লিখেছেন- ‘লজ্জা আমার শরসয্যা,প্রেম আমার চিতা।বিরহে পোড়া একাকী রাত এখন আমার মিতা।’
দেখা- কবিতায় লিখেছেন- ‘দেহ তার ঢেকেছো কি আদরের মধুর হত্যায় ভাস্করের মতো তাকে ছেনেছুনে কেটেকুটে দিয়েছো কি নতুন প্রত্যয়?’
এই বইয়ের প্রত্যেকটা কবিতায় কবির গভীর জীবনবোধের ছাপ স্পষ্ট। সেই প্রকাশ কখনও এসেছে মধ্যবিত্তের মুখ দিয়ে আবার কখনও এসেছে তাঁদের সামান্য চাওয়া পাওয়া, আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। জীবনে কি আছে কি নেই কি চাই এমন ভাবনাও উঠে এসেছে কবিতার চরণে। মধ্যবিত্ত সমাচার কবিতায় লিখেছেন- ‘তখোন কি শুধু পাপাচার, লোকাচার, লোকভয়, দলিল দোয়তপিষে মারবে মানব ও মানবীর এতটুকু উষ্ণ অধিকার! হায় হায় মধ্যবিত্ত, - চমৎকার, অতি চমৎকার!’
লেখকের কবিতায় প্রেম, বিরহ, ভগ্ন হৃদয়ের আকুতি এবং জীবনের শেষ পরিণতি মৃত্যু ধরা দিয়ে ভিন্নধর্মী রূপকে। ‘সেফিটপিন’ কবিতায় লিখেছেন- ‘আমার তো হয় কেবল একটি চমৎকার ছিন্ন হৃদয়, ছিন্নভিন্ন পোশাক আর - গলায় আছে অসংখ্যবার এ চীৎকার:দিন আমাকে, দিন একটা সেফটিপিন;না হয় আমায় সেরেফ জবাই করে দিন!’
ঝুলন্ত পেরেক কবিতায় লিখেছেন- ‘ললাটে লাগাও তালা দুঠোঁটে কুলুপ;হৃৎপিণ্ডে বেঁধে রাখো লালফিতে কানে দাও সীসে!দুই করতল ভেদ করে চলে যাক লৌহশলাকার দেহ’ পূর্বসূরি পিতার কাছে লেখকের চাওয়াও ব্যক্ত করেছেন অকুণ্ঠ চিত্তে। পিতৃপুরুষ কবিতায় লিখেছেন- ‘চারদিকে অক্ষমতা, অজ্ঞতাকে থামাও তুমি। আকাশ ছিড়ে বৃষ্টি নামাও, বজ্র নামাও, মুছক এইসব। জংলাভূমির গর্ত থেকে তুলে আনো লোহার খনি ভিজুক বাড়ুক অমরতরু পল্লবিত মেধার বনে। ...................................................................হে অচেতন পিতৃপুরুষ, নতুন জন্ম আমাকে দাও,কুহক থেকে বাঁচাও আমায়, সাজাও আমায় নতুন শোভায়!’
লেখক দেবতাকূলকেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি। দেবতাদের নিয়ে যেসব গল্প পরিচিত আছে সেগুলো নিতান্তই আরাম আয়েশের। সেগুলোকে ব্যঙ্গ করে লেখক লিখেছেন- ‘সুন্দর আহার করে থাকেন এসব দেবতাপুঞ্জ প্রান্তরে শস্যনিড়ুনি দেওয়া কন্যার যৌবনের ঘ্রাণ যদি থাকে তবে শস্য ক্ষেত পিষে পিষে তারা নিংড়ে ফেলেন সে সব ঘ্রাণ ...............................................দেবতার আহার বড় কঠিন যন্ত্রণা সলাজ বনকুসুমও রেহাই পাবে না এ রকম ব্যভিচারী আহারের থেকে।’
বইয়ের শেষ কবিতা ‘মাতৃ বন্দনা’। তিন পর্বে এই কবিতাটা বিভক্ত। মাতৃত্বকে স্ফিঙ্কস ও আইসিস'র সাথে তুলনা করেছেন বারবার। গ্রিক পুরানের ‘স্ফিঙ্কস’ নারী আকৃতির এবং দুর্দান্ত শক্তিসম্পন্ন। ‘আইসিস’ হলো প্রাচীন মিশরীয় ধর্মবিশ্বাসে মাতৃত্ব, যাদু এবং ঊর্বরতার দেবী। তার মানে লেখক নারীকে একইসাথে দোর্দন্ড প্রতাপশালী আবার মাতৃত্বের মমতাময়ী বলে আখ্যায়িত করছেন। বলেছেন মাতৃত্বকে পূজা করার কথা। প্রথম পর্বে মাতৃত্বকে আইসিস আখ্যা দিয়ে লিখেছেন-
‘তুমি তো রাত্রির দেবী-তুমিই তো রহস্যের রহস্য-ললিতা,তুমিই তো প্রশ্ন তুলে প্রশ্ন হয়ে যায়। ...................................................সময়ের আঁধার অরণ্যে তুমি জীবনের সংঘর্ষে জ্বলা অনন্যা রাধিকা তুমি তো রাত্রির দেবী, সলোমন-মন্দিরে স্থাপিত।’
দ্বিতীয় পর্বে লিখেছেন- ‘আমি স্ফিঙ্কস সিংহের সাধনা আমি, মোহাবিষ্ট মধ্যবিত্ত নই ধর্মের প্রগাঢ় কর্মযোগে আমি যুগে যুগে আন্দোলিত হই। .................................................................................তীব্র তলোয়ার তুলে আমি বলি: থামাও কলুষ!কর্কশ লাভার মাথা ছিঁড়ে বলি-হে অন্ধ জৌলুস,’
তৃতীয় পর্বে মাতৃত্বের একটা সামগ্রিক চিত্র এঁকেছেন এইভাবে- ‘আমার ললাটে চোখে জেগে ওঠে পরিত্রান গান আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে জ্যোতির্ময় কল্যাণের দান। ....................................................................তোমার নাচের শব্দ শুনি আমি আত্মার কান্নায় জন্মের কাননে শুনি নৃত্যময় মৃত্যুর বোধন, শুনি জন্ম!কলহাস্যে আলিঙ্গনাবদ্ধা জননী-জননী: স্ফিঙ্কস ও আইসিস!’
সুরাইয়া খানম মাত্র একটা কবিতার বই প্রকাশ করেই বাংলা তার স্বাতন্ত্র্য অবস্থান বুঝিয়ে দিতে পেরেছিলেন। আমি তার কবিতার বইয়ের আলোচনা করতে গিয়ে তার ব্যক্তিজীবনকে আলাদা করে রেখেছিলাম। কারণ সুরাইয়া খানম বাংলাদেশের ইতিহাস এবং সাহিত্যের এক নিঃসঙ্গ শেরপার নাম।
শেরপারা যেমন কোন ধরনের নিরাপত্তা পরিমাপক ছাড়াই হিমালয়ের চূড়ায় আরোহন করেন ঠিক তেমনি সুরাইয়া খানম একজন নারী হয়েও নিজেই নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, ভাঙতে চেয়েছিলেন আমাদের তথাকথিত ভাবনার বলয়। এই কাব্যগ্রন্থে সেই ভাবটিই প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে।
এমআরএম/জিকেএস