কৃষকের ঘরে উঠতে শুরু করেছে আমন ধান। বুক ভরা আশা নিয়ে কৃষক ধান কাটা শুরু করলেও দাম নিয়ে তারা নিরাশ হচ্ছেন। চাষিরা বলছেন, এবার সার সংকট ও বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন কম হচ্ছে। এর ওপর উৎপাদন খরচ অনুযায়ী তারা দাম পাচ্ছেন না।
তারা আরও বলছেন, ধান কত টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এটা হিসাব করার আগে উৎপাদন খরচ হিসাব করা দরকার সংশ্লিষ্টদের। বাস্তবতার নিরিখে সরকারিভাবে ধানের সংগ্রহমূল্য বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পাবনায় মোট ৫৪ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে রোপা ধান আবাদ হয়েছে। চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আশা করছে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। তবে চাষিরা জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে সার সংকট এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ফলন কম হচ্ছে। ধানে অনেক চিটাও রয়েছে।
পাবনার বিভিন্ন উপজেলায় রোপা আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। নতুন ধান বাজারে উঠতে শুরু করেছে। রোপা আমন ধান প্রতি মণ ১২০০-১৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চিকন বা সুগন্ধি জাতের ধানের দাম আরেকটু বেশি।
তবে এ দামে ধান বিক্রি করেও চাষিদের আশানুরূপ লাভ হচ্ছে না। তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় জমি চাষের দামও বেড়েছে। সারের দাম, শ্রমিকদের দাম, কীটনাশকের দাম বেড়েছে। এমনকী মাড়াইযন্ত্র ডিজেলচালিত হওয়ায় ধান মাড়াইয়েরও খরচও বেড়েছে। এতে করে চাষির খরচ যে হারে বেড়েছে সে অনুপাতে ধানের দাম বাড়েনি। এজন্য তারা খুব কমই লাভের মুখ দেখছেন।
চাষিরা জানিয়েছেন, গতবারের চেয়ে এবার বাজারে ধানের দাম বেড়েছে মনপ্রতি ১০০-২০০ টাকা। কিন্তু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি দ্বিগুণের কাছাকাছি চলে গেছে। আর জমি লিজ নেওয়া চাষিদের খরচ আরও বেশি। তাদের প্রতিবছর বিঘায় ১৫ হাজার টাকা জমি মালিককে দিতে হয়।
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, প্রতি বিঘায় গড়ে ধানের ফলন হয়েছে ১৫ মণ। এর মধ্যে খরচ যায় বিঘাপ্রতি ১০ হাজার টাকার মতো। এক্ষেত্রে প্রতি মণ ধানের দাম ১২০০-১৩৫০ টাকা ধরে এক বিঘা জমি থেকে জমি মালিক নিজে চাষ করলে বিঘাপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকা লাভ থাকে। কিন্তু যারা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেন তাদের জমির মালিককে যে টাকা দিতে হয় তা বাদ দিলে কিছুই থাকে না।
জেলার বিভিন্ন স্থানের চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাবনায় এখন যে দামে ধান বিক্রি হচ্ছে এতে তারা খুশি নন। কারণ উৎপাদন খরচ বাদে তাদের লাভ থাকছে না। অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ধান চাষ করায় বাদ দেবেন বলে জানিয়েছেন। তারা বলছেন, নিজের সংসারের জন্য যে পরিমাণ ধান লাগে সেটুকু জমি আবাদ করবেন। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, যত বেশি আবাদ করা হচ্ছে তত বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এতে আগামীতে পাবনায় ধানের উৎপাদন কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
সাঁথিয়া উপজেলার বামনডাঙ্গা গ্রামের ধানচাষি আব্দুল মজিদ বলেন, এবার ধান আবাদে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জমি চাষের খরচ বেড়েছ। সার-কীটনাশকের দাম, শ্রমিকের দাম বেশি। এমনকী ধান মাড়াই মেশিনের মজুরি বেড়েছে। এছাড়া এবার তারা ঠিকমতো সার পাননি। এতে ফলন কম হয়েছে।
বর্গাচাষি আনছার আলী বললেন, তিনি একটি জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু উৎপাদর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই সেই জমি ছেড়ে দিয়েছেন।
আতাইকুলা থানার পদ্মবিলা গ্রামের চাষি জয়নাল আবেদীন জানান, ধান আবাদ করে লাভ খুব কমে গেছে। সব কিছুতেই খরচ বেড়ে গেছে। সে অনুপাতে ধানের দাম বাড়েনি।
ধান মাড়াই যন্ত্রের মালিক দেলোয়ার সেখ জানান, গতবছরও তারা প্রতি মণ ধান মাড়াই করে আড়াই কেজি ধান নিয়েছেন। এবার নিচ্ছেন প্রতি মণে চার কেজি। এতেও তাদের পোষায় না। কারণ জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
জমিতে কাজ করা শ্রমিক সাহেব আলী বললেন, তারা অন্য গ্রাম থেকে ধান কাটতে বামনডাঙ্গা এসেছেনে। তারা সাতজন প্রতিদিন ৭০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন।
মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) পাবনার অন্যতম বড় হাট বনগ্রাম হাটে গিয়ে জানা যায়, আমন ধান প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৩৫০ টাকা আর একটু চিকন মানের ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১৪৫০ টাকা মন দরে।
চাষিরা জানান, গত বছর এ সময়ে মোটা ধানের দর ছিল ১১০০-১১৫০ টাকা মণ। মোটামুটি চিকন জাতের ধান ছিল প্রতি মণ ১২০০-১৩০০ টাকা। কিন্তু এক বছরের মধ্যে চাষাবাদে যে খরচ বেড়েছে সে অনুপাতে দাম বাড়েনি।
তারা বলছেন, অনেকের ধারণা ধানের দাম ১২০০ বা ১৪০০ টাকা মণ উঠে গেছে! কিন্তু তারা হিসাব করছেন না এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে খরচ কত হচ্ছে।
বনগ্রাম হাটে ধান বিক্রি করতে আসা ভদ্রকোলা গ্রামের চষি আজিজ সেখ জানান, তিনি ১২৫০ টাকা দরে ধান বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, চাষের দামে বেশি, সারের দাম বেশি, শ্রমিকের দাম বেশি। এতে তারা ধান চাষে লাভ করতে পারছেন না। তাই আগামীতে শুধু নিজের পরিবারের যেটুকু প্রয়োজন শুধু সেটুকু জমিতে ধান চাষ করবেন। বিক্রির জন্য আর বেশি জমিতে ধান আবাদ করবেন না।
জমি লিজ নেওয়া চাষি আব্দুল থালেক জানান, ১২০০ টকা মণ দরে ধান বিক্রি করলেন। এ দামে তাদের পোষায় না। জমির মালিককে বছরে দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা। এছাড়া অন্যান্য সব রকম খরচ বেড়ে গেছে। তাই ধানের মণ দুই হাজার টাকা হলে তাদের পোষাবে।
ঈশ্বরদীর জনপ্রিয় কৃষক এবং বাংলাদেশ ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহজাহান জানান, ধানের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, ফলন কমছে। অথচ চাষি কম দাম পাচ্ছেন। বাস্তবতা বুঝে সরকারের ধানের সংগ্রহ মূল্য বেশি নির্ধারণ করা উচিত।
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার ক্ষেতে ফলন মোটামুটি ভালো হয়েছে। বর্ষা মৌসুম বলে সেচ কম লেগেছে। আর কৃষকরা যেটাকে সার কম দেওয়া বলেছেন আসলে সার পরিমিত পরিমাণ তারা দিয়েছেন। এতে অপচয় কম হয়ে তাদের খরচ সাশ্রয় হয়েছে। চাষিরা সরকারের সংগ্রহমূল্যের (২৭ টাকা কেজি) চেয়েও বাজারে বেশি দাম পাচ্ছেন।
এমআরআর/এএসএম