সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শেষে পদ্মায় জাল ফেলছে জেলেরা। তিন সপ্তাহ অপেক্ষার পর ইলিশ ধরতে নেমে হতাশ তারা। খুব কম জেলের ভাগ্যে জুটছে দু‘চারটি ইলিশ। কিন্তু তাও আকারে ছোট। এছাড়া দেখা মিলছে না অন্য কোনো মাছেরও।
রাত-দিন জেলেরা নদী চষে বেড়ালেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা। জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বাচা, চিংড়ি, গাঙগারি, বাঁশপাতা, পিয়ালি, কাচকি, রিঠা, ঘেরে, বেলে, পাতাশী মাছ। কিন্তু সেটাও পরিমাণে খুব কম। কারো জালে দুই একটা ছোট বাঘাইড় ও পাঙাস ধরা পড়ছে। যে পরিমাণ মাছ ধরা পড়ছে তাতে নৌকা-জালের খরচও উঠছে না।
বৃহস্পতিবার (১৭ নভেম্বর) সকাল ৬টায় পাকশী হার্ডিঞ্জব্রিজ পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, রাতভর জেলেরা মাছ ধরে একে একে নৌকা নিয়ে ঘাটে ফিরছেন। রাতের ধরা মাছ তারা বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন। সারারাত জাল টেনে ধরা মাছ দেখে জেলেরাই হতাশ। কারণ এ মাছ বিক্রি করে তাদের হাজিরাই উঠছে না।
পাকশী জেলে পল্লীর মিলন কুমার জাগো নিউজকে জানান, এবার পদ্মায় ইলিশ নেই বললেই চলে। হঠাৎ দু-একটা ধরা পরছে। অন্য মাছেরও আকাল। দিনরাত নদীতে মাছ ধরে ১৫০-২৫০ টাকার বেশি হাজিরা হয় না। মনের দুঃখে অনেকেই নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন না। বেকার ও অলস সময় কাটাচ্ছেন।
একই এলাকার জেলে অজিত বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাপ-দাদার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরছি। মাছের এমন আকাল আগে কখনো দেখিনি। মাছ না পেয়ে আমরা যে কি কষ্টে আছি তা বলে বুঝানো যাবে না।
সাঁড়ার ৫ নম্বর ঘাটের জেলে আমিরুল ইসলাম মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, একটি নৌকাতে চার থেকে পাঁচজন জেলে মাছ ধরে। সারাদিন মাছ ধরে নৌকা, জাল ও শ্যালো মেশিনের ইঞ্চিনের ডিজেল খরচ মেটানো শেষে জেলেদের ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা হাজিরা হয় না। এখন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের যে দাম এ টাকা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। মাছ সংকট যেভাবে বাড়ছে এতে এক সময় জেলেদের না খেয়ে মরতে হবে।
সাঁড়া ঘাটের জেলে রেজাউল ইসলাম রেজা বলেন, নিষেধাজ্ঞার পর অনেক আশা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে নেমেছি। কিন্তু আমরা সবাই হতাশ। জেলেরা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে নৌকা ও জাল কিনেছি। মাছ ধরে এ টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এবার মাছ ধরে আমাদের খাওয়ার টাকাই হচ্ছে না কিভাবে ঋণ পরিশোধ করবো।
সাঁড়া মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, এ ঘাটে জেলের সংখ্যা প্রায় ৫০০। এখানকার জেলেরা ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরেন। বর্তমানে খুব একটা মাছ ধরা পড়ে না। সারারাত পাঁচজন জেলে নৌকায় জাল টেনে পাঁচকেজি মাছ ধরতে পারছে না। অথচ অন্যান্য সময় সারারাতে ১৫-২০ কেজি মাছ ধরা পড়তো। জেলেদের এমন দুর্দিন আগে দেখা যায়নি।
সাঁড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমদাদুল হক রানা সরদার বলেন, এ ইউনিয়নের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এবার নদীতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। জেলেদের খুব দুর্দিন যাচ্ছে। তাদের অনেকেই যোগাযোগ করেছেন। সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ না আসায় তাদের সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না।
উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাকিয়া সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, নদীতে মাছ সংকটের বিষয়টি জেলেরা জানিয়েছে। নদীতে জেলেরা চায়না, কারেন্ট ও মশারি জাল দিয়ে মাছ ধরছেন। এতে মাছের বংশ বিস্তার ও মাছ বড় হতে পারছে না। জেলেদের এ বিষয়ে সচেতন করা হলেও অনেকেই তা মানছেন না। এভাবে নদীতে মাছ কমতে থাকলে জেলেরা আর্থিক সংকটে পরবে এটাই স্বাভাবিক। নদীতে মাছ সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। পরবর্তীতে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবো।
শেখ মহসীন/জেএস/এএসএম