ফরিদপুরে প্রতিবছরই কমছে খেজুর গাছ। এতে বাধ্য হয়ে পেশা বদলাচ্ছেন গাছিরা। নতুন করে কেউ আর এ পেশায় আসছেন না। বর্তমানে যতগুলো গাছ টিকে আছে সেগুলো থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য গাছি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
, দিনে দিনে খেজুর গাছ কমছে আর গাছিদের পেশা বদলে যাচ্ছে। নতুন করে এ গাছি পেশায় কেউ না আসায় ফরিদপুর থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে গাছি। বর্তমানে প্রতি গ্রাম তো দূরে থাক কয়েক গ্রাম খুজেও পেশাদার একজন গাছির সন্ধান মিলবে কিনা সন্দেহ।
এক দশক আগেও ফরিদপুরের নয়টি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মেঠো পথে, বাড়ির আঙিনায়, জমির আইলে চোখে পড়তো সারি সারি খেজুর গাছ। এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামে বা মহল্লায় দেখা যেতো খেজুর গাছের মাথার দিকে বিশেষ কায়দায় কাণ্ড ছেঁটে রস সংগ্রহ করছেন গাছিরা। এখন কিছু কিছু এলাকায় অল্প কিছু খেজুর গাছ চোখে পড়লেও সেগুলো যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আলফাডাঙ্গার পাঁচুড়িয়া গ্রামের একজন প্রবীণ গাছি মফিজুর রহমান (৬৬)। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহের কাজ করছি। তবে এখন আগের মতো খেজুর গাছ নেই। গাছও নেই তাই গাছ কাটাও (রস সংগ্রহের প্রস্তুত করা) বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরও অল্প কয়েকটি গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করি।’
শীতের সময় মাসতিনেক খেজুর রস সংগ্রহের কাজ করেন মফিজুর রহমান। বছরের বাকি সময় নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
জাটিগ্রামের মালেক শেখ নামের আরেক গাছি জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় ১০ বছর খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। এখন খেজুর গাছ নেই। তাই পেশা পরিবর্তন করে এখন কৃষিকাজ করি।
ভাঙ্গা উপজেলার ভাঙ্গারদিয়া, সদরদী ও ভদ্রকান্দা গ্রামের গাছি সুজন পাল, আক্কাস আলী ও তোতা মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, খেঁজুর গাছ বিলুপ্তির জন্য অধিক জনসংখ্যা দায়ী। বাড়ি করার জন্য জায়গা ও কাঠের প্রয়োজন হয়। এজন্য গ্রামের খেঁজুরের বাগান কেটে সেখানে বাড়ি করা হচ্ছে। আগে প্রায় বাড়ি গাছি পাওয়া যেতো। তাদের বেশিরভাগই মারা গেছেন। তাদের ছেলেরা অন্য পেশায় গিয়ে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এ কারণে এই পেশা অনেকে ছেড়ে দিয়েছেন।
তারা আরও বলেন, খেজুর গাছ রোপণ কম, অনাবাদি পড়ে থাকা, অনাগ্রহ, ভেজাল গুড় তৈরিসহ নানা কারণে যেমন খেজুর গাছ হ্রাস পাচ্ছে। তেমনি খেজুর গাছ কমে যাওয়া, রস ও গুড়ের ঐতিহ্য হারানোর কারণে গাছিও প্রায় বিলুপ্তির পথে।
ফরিদপুরে স্থানীয় গাছি বিলুপ্তির কারণে রাজশাহী থেকে লোক এনে গুড় তৈরি করা হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে শীতের সময় তারা দলবেধে ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় আসেন। প্রতিষ্ঠান ও মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে শীত মৌসুমের তিন মাস রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন।
ফরিদপুর শহরতলীর গঙ্গাবর্দী এলাকার কৃষি ইনস্টিটিউট এলাকায় এমন বেশ কয়েকজন গাছির সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই এলাকার বাসিন্দা এনামুল হাসান গিয়াস জাগো নিউজকে বলেন, খেজুর গাছের সংখ্যা দিনে দিনে কমছেই। তাছাড়া গাছ কেটে রস বের করার মতো গাছিও বিলুপ্তির পথে। এজন্য রাজশাহী, যশোরসহ দূর-দূরান্তের বিভিন্ন জেলা থেকে গাছি এনে তিনি প্রায় ১৫০০ খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দিঘা গ্রাম থেকে আসা গাছি লালন আলী জাগো নিউজকে বলেন, নভেম্বর মাসের শুরুতে দুজন সহযোগীকে নিয়ে ফরিদপুরে এসেছি। ফরিদপুরের কৃষি কলেজ ও আশপাশের প্রায় দেড় শতাধিক খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছি।
সেলিম মণ্ডল ও আরশাদ শেখ নামের দুই গাছি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের বাড়ি রাজশাহী। এখানে সাড়ে তিনমাস মাস থাকবো। এসময় থাকা-খাওয়া ও গুড় তৈরির জ্বালানি খরচ বাদে একেকজন ৮০-৯০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবো বলে আশা করছি।’
এ বিষয়ে ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বলেন, ফরিদপুরের খেজুর গুড়ের দেশব্যাপী সুনাম আছে। কিন্তু নানা কারণে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ফরিদপুরে গাছির সংখ্যাও বিলুপ্তির পথে।
তিনি বলেন, গাছ ও গাছি সংকটের কারণে গুড়ের উৎপাদনও দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খেজুর গাছ লাগানোর পাশাপাশি খেজুর গাছ রোপণে আগ্রহী করা হচ্ছে।
এন কে বি নয়ন/এসআর/জিকেএস