দেশজুড়ে

দিনটি সিরাজগঞ্জবাসীর জন্য বয়ে এনেছিল বিজয়ের বার্তা

সিরাজগঞ্জ মুক্ত দিবস আজ (১৪ ডিসেম্বর)। ১৯৭১ সালের এই দিনে সিরাজগঞ্জ শহরে উড়েছিল বাংলার স্বাধীন পতাকা। আর সেই পতাকা উড়াতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। ৫২ বছর আগের এ দিনটি সিরাজগঞ্জবাসীর জন্য বয়ে এনেছিল বিজয়ের বার্তা।

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার ঠিক দুইদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ শহর। এদিন সকাল ১০টার দিকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজগঞ্জ শহর দখল নিয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি শহর ও শহরতলীর আশপাশ থেকে হাজার হাজার কৃষক-শ্রমিক-জনতা জাতীয় পতাকা হাতে শহরে প্রবেশ করে। এদিন একযোগে সিরাজগঞ্জ মুক্ত দিবস ও বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালিত হয়।

বুধবার (১৪ ডিসেম্বর) সকালে ১৯৭১ সালের সেই দিনের অনুভূতি তুলে ধরে সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ শহরকে হানাদারমুক্ত করতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথমেই সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের শৈলাবাড়ী পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করি। প্রচণ্ড যুদ্ধে ওইদিন শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ। সেদিন হানাদারদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের সঙ্গে টিকে থাকতে না পেরে পিছু হটেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরদিন ১০ ডিসেম্বর যুদ্ধে ক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধারা বিশ্রাম নেন। ১১ ও ১২ ডিসেম্বর কয়েক দফায় আক্রমণ চালানো হয় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে। ১৩ ডিসেম্বর থেকেই হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজগঞ্জ শহরকে হানাদার মুক্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। তিনদিক থেকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মোজাম্মেল হক ও ইসহাক আলীর নেতৃত্বে পূর্ব দিক থেকে, সোহরাব আলী ও লুৎফর রহমান দুদুর নেতৃত্বে পশ্চিম দিক থেকে এবং আমির হোসেন ভুলু ও জহুরুল ইসলামের নেতৃত্বে উত্তর দিক থেকে আক্রমণ করে।

এছাড়াও দক্ষিণ দিক থেকে ইসমাইল হোসেন ও আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ওইদিন রাত ৩টা পর্যন্ত প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে টিকতে না পেরে হানাদার বাহিনী ট্রেনে করে ঈশ্বরদীর দিকে পালিয়ে যায়।

১৪ ডিসেম্বর ভোরে শহরের ওয়াপদা অফিসে হানাদার বাহিনীর মূল ক্যাম্প দখলে নেন মুক্তিযোদ্ধারা। ওইদিন কওমি জুটমিল, মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়সহ বিভিন্নস্থানে উড়িয়ে দেওয়া হয় লাল-সবুজের পতাকা। সম্পূর্ণরূপে পাক হানাদার মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইসমাইল হোসেনকে (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) এবং মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয় মরহুম আমির হোসেন ভুলুকে।

বীরমুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম শফি জাগো নিউজকে বলেন, ৯, ১১, ১২ ও ১৩ ডিসেম্বর চারদিনব্যাপী যুদ্ধ চলেছিল। এ যুদ্ধে শহীদ হন ইঞ্জিনিয়ার আহসান হাবিব কালু, সুলতান মাহমুদসহ ছয় বীর মুক্তিযোদ্ধা। এর আগে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সিরাজগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প স্থাপন করেই নানা রকম নির্যাতন শুরু করে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে পুরো শহর। নিষ্ঠুর ও জঘন্য পৈশাচিকতা ছড়িয়ে পড়ে শহরতলীসহ গ্রামীণ জনপদে।

বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মন্টু জাগো নিউজকে বলেন, ১৭ জুন ১৯৭১ সিরাজগঞ্জের বেসরকারি সাব সেক্টর পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের নেতৃত্বে কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাটে প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এরপর থেকে বাঘাবাড়ী, নওগাঁ, বরইতলী, বাগবাটি, ঘাটিনার ব্রিজ, ছোনগাছা, ভাটপিয়ারী, শৈলাবাড়ী, ব্রহ্মগাছা, ঝাঐলসহ বিভিন্নস্থানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এ বিজয়ের দিনটিকে উদযাপন করতে জেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগ পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করে।

জেএস/জেআইএম