দেশজুড়ে

ছুটিতেও কক্সবাজারে পর্যটকের অভাব, হতাশ ব্যবসায়ীরা

ভরা মৌসুমেও কক্সবাজারে নেই পর্যটক। বালিয়াড়ি ও আশপাশের পর্যটন স্পটগুলোতে লোকারণ্য হয়ে থাকার কথা থাকলেও এখন যেন শূন্যতা। হাতে গোনা কিছু পর্যটকের উপস্থিতি আশানুরূপ ব্যবসা হচ্ছে না। সেন্টমার্টিন ভ্রমণ সংকুচিত হওয়াসহ নানা কারণে এবার পর্যটক সমাগম কমেছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। ফলে লগ্নি ফিরে আসা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম সিকদার বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে কাগজে-কলমে পর্যটন মৌসুম। তবে নভেম্বরের শেষ আর ডিসেম্বরের শুরু থেকে ভিড় বাড়ে ভ্রমণপিপাসুদের। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে সন্তানদের নিয়ে পরিবারগুলো কক্সবাজারে আসে এবং সেন্টমার্টিন ভ্রমণে যান। করপোরেট অফিসের অনেকে বার্ষিক কনফারেন্সগুলো কক্সবাজারেই করে।

আবুল কাসেম আরও বলেন, এখন মৌসুমের মাঝামাঝি সময় চললেও পর্যটক খরা চলছে। বিগত সময়ে বিজয় দিবস উপলক্ষে পর্যটকে টইটম্বুর হতো কক্সবাজার। অনেক পর্যটক হোটেলে রুম না পেয়ে সড়কের কিনারে, বালিয়াড়ি, গাড়িতে রাত কাটানোর চিত্রও অতীতে চোখে পড়েছে। কিন্তু শুক্রবার বিজয় দিবস এবং শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও হাতেগোনা পর্যটকই এবার কক্সবাজারে এসেছেন। মাত্র ১৫-২০ শতাংশ রুম বুকিং ছিল এবার। আমরা চরম হতাশ।

হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও হোয়াইট অর্কিড হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার রিয়াদ ইফতেখার জাগো নিউজকে বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে সৈকতের বালিয়াড়িতে লোকজনের ভিড় বাড়ে। এবার ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস এবং সাপ্তাহিক ছুটি একইদিন পড়েছে। এতেও আগের মতোই লোকসমাগম হয়েছে। বালিয়াড়িতে ভিড় বাড়লেও সবাই পর্যটক নন। এখানে সৈকত দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি, যারা পৌর শহর কিংবা আশপাশের এলাকা থেকে আসেন আর সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে যান। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ও কক্সবাজারের স্থল উপজেলার লোকজন কক্সবাজারে দিনে এসে দিনেই ফিরে যান। ট্যুরস অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি মো. রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, কক্সবাজার বেড়াতে আসা পর্যটকদের ৭০ শতাংশ সেন্টমার্টিনের নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যান। সেই হিসেবে গত কয়েক দশক ধরে প্রবালদ্বীপকে ঘিরেই কক্সবাজারের পর্যটন। কিন্তু চলতি মৌসুমে অদৃশ্য কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ আছে। সেটা জেনেই কক্সবাজারে পর্যটক আসা কমেছে।

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জাহাজ চলাচল শুরু না হলে মৌসুমের বাকি সময়ও একইভাবে মন্দা যাবে এতে সন্দেহ নেই। সুগন্ধা ঝিনুক মার্কেট সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম জাগো নিউজকে বলেন, অনেক গণমাধ্যম আমাদের পর্যটনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। সৈকতের বালিয়াড়িতে লোক উপস্থিতি দেখলেই প্রতিবেদন করে পর্যটকে ভরপুর কক্সবাজার। কিন্তু কারা পর্যটক এবং কারা দর্শনার্থী এটা পৃথক করার সক্ষমতা অনেকেই রাখেন না। ভিডিও প্রতিবেদন যারা করেন, তারা পুরো সৈকতে যেখানে কয়েকজন জটলা করেন তাদের ধারণ করেন, খালি অংশটা এড়িয়ে যান। সেটা প্রচার হলে সারাদেশ এবং পৃথিবীবাসী ও সরকার ভুল ম্যাসেজটা পায়। এছাড়া কোথাও পান থেকে চুন খসলে ভেতরের খবর বের করার আগে নেগেটিভ প্রচারণাটা করেন। এসবই কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করছে। আমরা যারা পর্যটনকে উপলক্ষ করে ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় লগ্নি করেছি তাদের সর্বস্ব হারানোর উপক্রম হয়েছে।

সী-ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (স্কোয়াব) সভাপতি তোফায়েল আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিবছর টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে ১০টি পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করে। কিন্তু এবার কক্সবাজার থেকে কর্ণফুলী জাহাজটি ছাড়া টেকনাফ থেকে কোনো জাহাজ চলাচল করছে না। কর্ণফুলী জাহাজে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ ব্যয়বহুল। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পর্যটকরা এটাতে ভ্রমণ করতে পারেন না। এছাড়া কর্ণফুলী জাহাজের ধারণ ক্ষমতাও কম। তাই মধ্য ও নিম্নবিত্ত পর্যটকের কক্সবাজার ভ্রমণে আসা বিগত সময়ের চেয়ে কমেছে। টেকনাফে বর্তমান ঘাট থেকে সমস্যা হলে সাবরাংয়ের জেটি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা যায়। এখান থেকে জাহাজগুলো সেন্টমার্টিন ঘাটে পৌঁছানো অধিকতর সহজ এবং ভাড়া বাড়বে না সময়ও কম লাগবে।

সেন্টমার্টির দ্বীপের আবাসন ব্যবসায়ী মো. দিদারুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, সেন্টমার্টিনের প্রায় ১০ হাজার মানুষের ৯০ শতাংশই পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বাকি ১০ শতাংশ মানুষের রুটিরুজি নির্ভর করে সাগরে মাছ ধরায়৷ আর পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের আয় হয় মাত্র চার মাস। কিন্তু ভরা মৌসুমেও দ্বীপে আশানুরূপ পর্যটক যেতে না পারায় আমাদের লগ্নি উঠে আসবে বলে মনে হয় না। আয় বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে আমাদের। দ্বীপের অধিকাংশ হোটেল ভাড়ায় নেওয়া। তারাও আমার মতো অবস্থা পার করছে। তাই বাকি সময়ের জন্য হলেও টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে সরকার ও প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হোটেল ওশান প্যারাডাইস লিমিটেডের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু জাগো নিউজকে বলেন, সারা বছরই কক্সবাজারে পর্যটন জমানো সম্ভব। কিন্তু সেভাবে সুযোগ-সুবিধা গড়ে না ওঠায় পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে আবাসন ও খাবার প্রতিষ্ঠান এবং অন্য ব্যবসাগুলো সাজিয়ে প্রস্তুত করা হয়। অর্ধসহস্রাধিক হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজ ভরামৌসুমেও পর্যটক না পেয়ে হতাশায় ভুগছে। আমাদের শতকোটি টাকা ঋণ চলমান, ব্যবসা না পেলে ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খেতে হয়। কমবেশি সবাই এ সমস্যায় পতিত হন। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের লোকসানের শঙ্কা আছে।

কক্সবাজারের নবাগত জেলা প্রশাসক (ডিসি) মুহম্মদ শাহীন ইমরান জাগো নিউজকে বলেন, পর্যটন সম্ভাবনাময় শিল্প। এর প্রসারে সরকার করণীয় সবকিছুই করছে। টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ নাব্য সংকটের কারণে। বিকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন মহলে লিখেছি। এখানে নৌ-মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টতা আছে। আমাদের পাঠানো চিঠির বিষয়ে নির্দেশনা এলে তা দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

এসজে/এমএস