এগারো বছরের ছোট্ট সাদিয়া পড়াশোনা করে তৃতীয় শ্রেণিতে। এই বয়সে তার সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা থাকলেও হার্টে তিনটি ছিদ্র নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে শিশুটি।
সাদিয়ার চিকিৎসায় প্রয়োজন চার লাখ টাকা যা তার দরিদ্র বাবার পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব। তাই সমাজের বিত্তবানদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে অসহায় পরিবারটি।
শিশু সাদিয়ার বাড়ি দিনাজপুরের হাকিমপুর পৌরসভার চুরিপট্টি এলাকায়। বাবার নাম সানাউল হক। স্থানীয় একটি খাবার হোটেলে কাজ করেন তিনি। মা সালমা খাতুন বাজারে বিভিন্ন দোকানের ছেঁড়া বস্তা সেলাই করেন।
সাদিয়ার বাবা সানাউল হক জাগো নিউজকে বলেন, আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে স্নিগ্ধা (১৬) ও ছোট মেয়ে সাদিয়া। সাদিয়ার বয়স যখন তিন বছর, হঠাৎ একদিন বুকের ব্যথা শুরু। ওই সময় স্থানীয় অনেক চিকিৎসকের কাছে তাকে চিকিৎসা করাই। কিন্তু দিন যতই যেতে থাকে সাদিয়ার বুকের ব্যথা বেশি হতে থাকে।
তিনি বলেন, পরে ঢাকার এক চিকিৎসক বেশকিছু টেস্ট করালে সাদিয়ার হার্টে তিনটি ছিদ্র ধরা পড়ে। এর পর থেকে বিভিন্ন চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খাওয়ালেও সেটি নিরাময় হয়নি। বরং দিন যতই যাচ্ছে মেয়েটার হার্টের ছিদ্রের আকার বড় হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সাদিয়ার অপারেশন না করালে তার বড় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
সাদিয়ার বাবা আরও বলেন, ছোট থেকে মেয়ের চিকিৎসা করাতে অভাবের সংসারে সবই শেষ। আমার এক শতাংশ জমিও নেই। সারাদিন হোটেলে কাজ করে যে ৩০০ টাকা আয় হয় তা দিয়ে কোনো মতে সংসার চলে। মেয়ের অপারেশনের জন্য এখন চার লাখ টাকা প্রয়োজন। অপারেশন করাতে না পারলে মেয়েটার জীবনপ্রদীপ নিভে যাবে।
সরেজমিনে শুক্রবার (২৩ ডিসেম্বর) দুপুরে সাদিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ কুটিরের সামনে বারান্দায় বসে একা একা কাঁদছে শিশুটি। মেয়েটির মুখে নেই কোনো কথা। একা একা দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে।
সাদিয়ার মা সালমা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, যে বয়সে মেয়েটার হেসেখেলে বেড়ানোর কথা, সে বয়সে তার একা চলাফেরা করাই কষ্টকর। তার সমবয়সী সবাই এদিক সেদিকে ছোটাছুটি করলেও সাদিয়া তার রোগের কাছে অসহায়। অল্প হাটতেই হাঁপিয়ে ওঠে, দম বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলে ভর্তি হলেও চলাফেরা করতে না পারায় এক বছর ধরে স্কুলে যেতে পারে না। দিন যতই যাচ্ছে ততই অসুস্থ হয়ে পড়ছে সাদিয়া।
তিনি বলেন, মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে এখন অনেকটা পথে বসার উপক্রম। ধারদেনার বোঝা অনেক বড় হচ্ছে। এখন অল্প সময়ে এত টাকা কীভাবে পাই।
শিশু সাদিয়া জাগো নিউজকে বলে, আমি বেশি হাঁটতে পারি না। অন্য শিশুদের খেলা দেখলে কষ্ট হয়। একটু হাঁটলে বুকের ভেতর ব্যথা লাগে, কষ্ট হয়। হাঁটতে না পারায় বেশ কিছুদিন ধরে স্কুলে যেতে পারিনি। বাড়িতে বসে বসে একাই খেলি।
বাসুদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান আনোয়ারুল হক শিক্ষক জাগো নিউজকে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে শিশু সাদিয়া অসুস্থ। সবার সহযোগিতায় সাদিয়া ভালো হয়ে আবারও বিদ্যালয়ে আসবে এমনটাই প্রত্যাশা।
প্রতিবেশী আকবর আলী জাগো নিউজকে বলেন, আমার খুব খারাপ লাগে যখন মেয়েটার মুখের দিকে দেখি। আমারও একটা মেয়ে আছে, ও যখন খেলা করে তখন সাদিয়া চুপ করে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকে।
আরেক প্রতিবেশী ষাটোর্ধ্ব আকলিমা খাতুন বলেন, মেয়েটার কষ্ট দেখলে নিজের কান্না পায়। সাদিয়ার মা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তার চিকিৎসা চালাচ্ছে। এবার অপারেশন করতে নাকি চার লাখ টাকা লাগবে। অভাবের সংসারে এত টাকা কীভাবে জোগাড় হবে আমার মাথায় আসে না।
এ বিষয়ে হাকিমপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন উর রশীদ বলেন, আমরা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে শিশু সাদিয়ার চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলাম। উপজেলা পরিষদ তার চিকিৎসার জন্য সবসময় পাশে থাকবে।
মো. মাহাবুর রহমান/এমআরআর/জেআইএম