ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ ফারুককে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও অশালীন আচরণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, আদালত পেশিশক্তি দেখানোর জায়গা নয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীরা যে আচরণ করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি। নজিরবিহীন এ ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আইনজীবীরা এমন আচরণ করলে সাধারণ মানুষ যাবেন কোথায়? এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে আইন আদালত বলে কিছু থাকবে না বলেও মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।
এসময় উপস্থিত আইনজীবী নেতাদের উদ্দেশ করে হাইকোর্ট বলেন, কোনো কোর্ট বর্জন করবেন না। সবাই মিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের থামান। অন্যথায় আমাদের সবাইকে জ্বলতে হবে।
মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। এরপর আইনজীবীদের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বার নেতৃবৃন্দের পক্ষে শুনানিতে আদালতে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, আদালত অবমাননার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য আমরা দুই মাস সময় প্রার্থনা করছি। আদালত বলেন, আপনারা কি কনটেস্ট করতে চাচ্ছেন? আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, আমরা ঘটনার ব্যাখ্যা করবো। এ কারণে সময় চাইছি।
আদালত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বার সভাপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি তো শুধু আইনজীবী নন। আপনি আইনজীবীদের নেতা। মানুষ যখন বড় পদে যায়, তখন আরও বিনয়ী হয়। তার দায়িত্ব বেড়ে যায়।
এসময় আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার সভাপতি আইনজীবী সমিতির সব সদস্যের পক্ষে কথা বলেছেন। এটা বারের সিদ্ধান্ত ছিল। উনি ব্যক্তিগত স্বার্থে এটা করেননি। তিনি সাধারণ আইনজীবীদের স্বার্থে কথা বলেছেন।
হাইকোর্ট বলেন, আদালত তো শক্তি প্রদর্শনের জায়গা নয়। শুধু ভোটের চিন্তা করবেন না। আমাদের সবার ইমেজের বিষয়। আদালতকে অসম্মান করতে থাকলে এটা কারও জন্য শুভ হবে না। আদালতকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। তাহলে আপনারা সম্মান পাবেন। আদালত না থাকলে আপনারাও থাকবেন না।
এসময় সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির ও অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য সময় আবেদন করেন। তখন আদালত বলেন, আমরা সময় দিতে পারি, আপনারা পরিস্থিতি কুল ডাউন করুন। কোনো কোর্ট বর্জন করবেন না।
অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি, সম্পাদক, আইনজীবী এম সাঈদ আহমেদ রাজা, অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জরুল হক আদালতকে বলেন, আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছি। কাজ শুরু করেছি। আমাদের সময় দিন।
এসময় সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় আপনারা আইনজীবীদের তলব করেছেন। আদালত অবমানার রুলও জারি করেছেন। কিন্তু বিচারকদের প্রতি আদালত অবমাননার রুল জারি করেননি। বিচারকদের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার রুল জারি করুন।
এসময় আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উচ্চস্বরে ঠিক ঠিক বলে ওঠেন। তখন আদালত বলেন, এটা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। এখানে কি বার আর বেঞ্চের যুদ্ধ শুরু হয়েছে? এজলাস কক্ষে কি বাইরে থেকে লোক ঢুকেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা তো এ রকম করতে পারেন না।
এ ঘটনায় অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আইনজীবীদের বলেন, আপনারা এটা করতে পারেন না। সবাই চুপ করুন।
শুনানির পুরো সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তানভীর আহমেদ ভূঞা, সম্পাদক (প্রশাসন) অ্যাডভোকেট মো. আক্কাস আলী ও অ্যাডভোকেট জুবায়ের ইসলাম এজলাস কক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। আদালত কক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. গোলাম রাব্বানী ছাড়াও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত ৫ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ ফারুককে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও অশালীন আচরণের ঘটনায় ব্রাক্ষণবাড়িয়া আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তানভীর আহমেদ ভূঞা, সম্পাদক (প্রশাসন) অ্যাডভোকেট মো. আক্কাস আলী ও অ্যাডভোকেট জুবায়ের ইসলামকে তলব করেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার দায়ে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন। এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।
এর আগে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও অশালীন আচরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিচার চেয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে অভিযোগ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ ফারুক। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাঠানো বিচারকের অভিযোগ বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠানো হয়।
এফএইচ/এমএইচআর