যশোরে স্বামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা করে ফেঁসে গেছেন স্ত্রী। মিথ্যা জখমি সনদ দিয়ে মামলা করায় আদালত প্রথমে স্বামীকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত স্বামী ওই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যান।
উচ্চ আদালতে জখমি সনদ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় স্বামীর সাজার আদেশ বাতিল ও বাদী স্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর যশোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক নিলুফার শিরীন সোমবার (৩১ জানুয়ারি) স্বামীকে খালাস দিয়ে বাদীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।
স্ত্রী রাবেয়া আক্তার যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার কৃষ্ণনগর পালপাড়ার একরাম আলীর মেয়ে। অন্যদিকে, স্বামী আজম মাহমুদ যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের বজলুর রশিদের ছেলে। ঘটনার সময় তিনি কুষ্টিয়ার খোকসা থানায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত ছিলেন।
আদালত সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১১ জুলাই রাবেয়া তার পুলিশ কর্মকর্তা স্বামীর বিরুদ্ধে যশোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলা করেন। তার অভিযোগ ছিল, বিয়ের পর থেকে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিলেন আজম মাহমুদ। তিনি বিভিন্ন সময় ওই টাকার জন্য নির্যাতন করতেন বলে মামলায় উল্লেখ করেন স্ত্রী।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালের ২৭ জুন আজম মাহমুদ স্ত্রী রাবেয়া আক্তারকে বেধড়ক মারধর করে আহত করেন। এরপর শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন। পরে রাবেয়াকে উদ্ধার করে স্বজনরা যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তিনি দুইদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর হাসপাতাল থেকে জখমি সনদ সংগ্রহ করে মামলা করেন স্ত্রী রাবেয়া আক্তার।
বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে ঝিকরগাছা উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আজম মাহমুদের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে মারধরের বিষয়টি সত্য। এরপর ২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক নিলুফার শিরীন, পুলিশ কর্মকর্তা আজম মাহমুদকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠান।
ওই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন আজম। আপিলে জাল জখমি সনদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। ২০২২ সালের ১৪ জুন বিচারপতি এ এন এম বশির উল্লাহ উভয়পক্ষের শুনানি শেষে নিম্ন আদালতকে বিষয়টি যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে জখমি সনদ যদি জাল হয় তাহলে আসামির সাজার আদেশ বাতিল করে বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন।
উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশ পেয়ে যশোরের নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক পিবিআইকে তদন্তের আদেশ দেন। জখমি সনদটি যে জাল ছিল সেটি পিবিআইয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়। ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর বিষয়টি আদালতকে অবহিত করে পিবিআই। এরপর চলতি বছরের গত ২৩ জানুয়ারি আদালত স্বামী আজম মাহমুদকে খালাস দিয়ে স্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেন। আদালত থেকে আদেশ পেয়ে ২৯ জানুয়ারি স্ত্রীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন স্বামী। এরপর আদালত রাবেয়া আক্তারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। সোমবার রাবেয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে বিচারক তা নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান।
এ আজম মাহমুদ জানান, ২০১৯ সালের ১১ জুলাই রাবেয়া আক্তার তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় রাবেয়া আক্তার একটি জাল মেডিকেল সনদ দাখিল করেন। এতে রায়ে আদালত তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত করে মেডিকেল সনদটি জালিয়াতির মাধ্যমে করা হয়েছে বলে প্রমাণ পায়। ফলে আজম মাহমুদ বাদী হয়ে যশোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ গত ২৯ জানুয়ারি রাবেয়া আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বিচারক আসামি রাবেয়া আক্তারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। সোমবার রাবেয়া ওই মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
যশোরের কোর্ট ইন্সপেক্টর রোকসানা খাতুন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর আদালতের আদেশে রাবেয়া আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মিলন রহমান/এমআরআর/জিকেএস