‘প্রথম থেকে বাসটি আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছিল। দুর্ঘটনাকবলিত আমাদের লাল রঙের বাসটি কয়েকবার সবার শেষে থেকে সবার আগেও যায়। তখন বাসের মধ্যে কেউ ঘুমাচ্ছিল, কেউ গানের তালে তালে নাচছিল। শেষবার আমাদের বাসটি সবার শেষে থেকেও প্রথম বাসটিকে ওভারটেক করতে যেয়ে উল্টে সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে মারি দিছে। তারপর আমরা পড়ি গেছি। তখন আমরা সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করি। এরপর দেখি আমরা হাসপাতালের বিছানায়।’
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে শুয়ে এভাবেই শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দিচ্ছিল শুক্রবার (১০ ফেব্রুয়ারি) যশোরের বাঘারপাড়া বাকড়ী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাসফরের বাস দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া অজয় ভৌমিক। সে দুর্ঘটনাকবলিত ওই বাসের মাঝের দিকে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়। বেঁচে ফিরলেও অল্প বয়সে এত বড় দুর্ঘটনার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে।
বৃহস্পতিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়ায় শিক্ষাসফরের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুজন নিহত হন। নিহতরা হলেন বাকড়ী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস ও বিদ্যালয়ের ল্যাব সহকারী সুদিপ্ত বিশ্বাস। ধর্মীয় আচার-রীতি অনুয়ায়ী শুক্রবার সকালে তাদের সৎকার সম্পন্ন হয়েছে।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪০ জন। তাদের গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, ফরিদপুর ও যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েকজনের অবস্থা অবনতি হলে ঢাকা ও খুলনায় রেফার করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা নবম শ্রেণির ছাত্র অজয় ভৌমিক বলে, ‘লাল রঙের বাসটিতে কোনো মেয়ে ছিল না। অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্র ও তিন থেকে চারজন স্যার ছিলেন। তার মধ্যে আমাদের বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস ও বিদ্যালয়ের ল্যাব সহকারী সুদিপ্ত বিশ্বাস বাসের প্রথম সিটে বসেছিলেন। তার দুই ছিট পেছনে আমি আর স্বপ্ন বিশ্বাস নামের আমার এক বন্ধু ছিল। সে ঘুমিয়ে ছিল আর আমি জেগে ছিলাম। দুর্ঘটনার আগে অনেক সুন্দর সময় কাটিয়েছি আমরা। দুর্ঘটনায় আমার সামনের দুজন মারা গেছে, ভাগ্যক্রমে আমরা বেঁচে গেছি।’
আরও পড়ুন: কাশিয়ানিতে স্কুলের পিকনিক বাস উল্টে নিহত ২, আহত ৪০
দশম শ্রেণির ছাত্র অনিক বিশ্বাস বলে, ‘তিনটি বাসই পরপর যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে একে অন্যের আগে পরে যাওযার প্রতিযোগিতা করছিল। দুর্ঘটনায় পড়ার পর পেছনের বাস দুটিতে থাকা স্যারেরা আমাদের উদ্ধার করেন। রক্তাক্ত অবস্থায় যশোর হাসপাতালে এনেছিল শুনেছি।’
আহতদের মধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ২৫ জন, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনজন আর খুলনা ও ঢাকায় চারজন ভর্তি রয়েছেন বলে বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান বলেন, যশোরে চিকিৎসাধীন ২৫ জনের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। এদের মধ্যে একজনকে আইসিইউতে ও বাকি চারজনকে ঢাকা ও খুলনায় রেফার করা হয়েছে।
আইসিইউতে থাকা আপন বিশ্বাসের মা ইরা বিশ্বাস বলেন, তার ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। বৃহস্পতিবার অনেক আনন্দ করে বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে যায়। ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলেমেয়ে। ছেলেটা ছোট বলে খুব আদরের। সেই ছেলেটা এখন আইসিইউতে। আনন্দ করতে গিয়ে এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে তার জীবন।’
বাকড়ী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মৃণাল কান্তি রায় বলেন, আহতদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় আমরা শোকাহত।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিশ্বজিৎ কুমার পাল বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালে তিনটি বাসে করে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থলে শিক্ষাসফরে যান দুই শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ও অফিস স্টাফরা। সারাদিন গোপালগঞ্জের বিভিন্ন স্থান ঘুরে সন্ধ্যার পর সমাধিস্থল থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাস তিনটি ফিরছিল। পথে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী ভাটিয়াপাড়া মোড়ে দ্বিতীয় বাসটি প্রথম বাসটিকে ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে প্রধান সড়ক থেকে বাসটি উল্টে সড়কের পাশে গাছে ধাক্কা লাগে।’
জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘দুর্ঘটনাকবলিত সব শিক্ষার্থীর চিকিৎসায় কোনো অসুবিধা হবে না। চিকিৎসার যাবতীয় অর্থ ও সহযোগিতা জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হবে। এ ঘটনায় আমরা শোকাহত।’
মিলন রহমান/এসআর/জিকেএস