ক্যাম্পাস

স্বপ্নভঙ্গের আশঙ্কায় শেকৃবির ১০ শিক্ষার্থী

ক্লাসে কম উপস্থিতির কারণে বিপাকে পড়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষার্থী। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার কারণে তাদের ভর্তি বাতিল হয়ে গেছে। এতে নিজেদের শিক্ষাজীবন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।

তাদের একজন ২০২০-২১ সেশনের কৃষি অনুষদের ৮০ ব্যাচে শিক্ষার্থী হাবিব। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ভালো সিরিয়াল ছিল। তারপরও নিজের বড় হওয়ার স্বপ্ন এবং পরিবারের হাল ধরতে এখানে ভর্তি হয়েছিলাম। ভর্তি হওয়ার পরেই জন্ডিসে আক্রান্ত হই। বিলিরুবিনের পরিমাণ এতটাই কম ছিল যে ডাক্তার আমাকে চার মাস বিশ্রামের পরামর্শ দেন। সুস্থ হয়ে এসেই দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টারের ক্লাস প্রায় শেষ এবং সামনেই প্রথম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা। এমতাবস্থায় ক্লাসে উপস্থিতি ৭০ শাংশের কম থাকায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়নি প্রশাসন। বর্তমানে নবীন (৮১ ব্যাচ) ব্যাচের ক্লাস শুরু হয়েছে। তাদের সঙ্গে ক্লাস করতে গিয়ে দেখতে পাই খাতায় আমার নাম নেই। কারণ জানতে গেলে ডিন অফিস থেকে জানতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী প্রথম সেমিস্টারে ক্লাসে উপস্থিত কম থাকা ও পরীক্ষা না দেওয়ায় আমি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নই।’

তিনি বলেন, ‘উপস্থিতি কমের কারণে ভর্তি বাতিল হতে পারে- এমন নিয়ম আমি জানতাম না, এমনকি কখনো এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও আমি জানি না। এদিকে নতুন ব্যাচের ক্লাসও শুরু হয়েছে মার্চের প্রথম দিন থেকে। অন্যদিকে আমি ভর্তি বাতিলের আশঙ্কায় দিন পার করছি। আমাকে এখন বলা হচ্ছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে যেন অথৈ পানিতে এসে পড়েছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো সাধ্য আমার নেই। বাড়িতেও এ অবস্থার কথা জানাতে পারছি না।’ চোখ মুছতে মুছতে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন হাবিব।

আরও পড়ুন>> শহরের বুকে যেন একটি সবুজ-হলুদ

শুধু হাবিব নয়, স্বপ্নভঙ্গের ঝুঁকিতে রয়েছেন তার মতো একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও নয় শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ছয়জন কৃষি অনুষদের। বাকি তিনজন এগ্রি বিজনেস ম্যানেজমেন্টের এবং একজন এএসভিএম অনুষদের।

তাদেরই একজন তানভীর। তিনি জানান, সেকেন্ড টাইম মেডিকেল প্রিপারেশনের জন্য প্রথম থেকেই ক্লাস করেননি। একইভাবে বাকি শিক্ষার্থীরাও নানা সমস্যা ও মেডিকেলে সেকেন্ড টাইম পরীক্ষার জন্য ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেননি। তাদের প্রশ্ন শেকৃবিতে তারা মেধার মূল্যায়ন দিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, তবে শুধুমাত্র ক্লাস, পরীক্ষায় অংশ না নিলেই ভর্তি বাতিলের মতো বড় সিদ্ধান্ত কেন? অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এমন নিয়ম রয়েছে কি না- সে প্রশ্নও করেন তারা।

তবে অনুষদ ভেদে এ নিয়মের ব্যতিক্রম দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা জানান, কৃষি অনুষদে বিষয়গুলো কঠোরভাবে দেখলেও অন্যান্য অনুষদের শিক্ষার্থীরা প্রথম থেকেই ক্লাস করছেন এবং ভর্তি বাতিলের ব্যাপারে নির্ভয়ে রয়েছেন।

এ বিষয়ে এগ্রি বিজনেস ম্যানেজমেন্টের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলেন, ‘ডিন অফিস থেকে খাতার নিচে আমাদের নাম ও রেজিস্ট্রেশন লিখে নিতে বলেছিল। সেভাবে লিখে আমরা ক্লাস করছি এবং ক্লাসে উপস্থিতি মূল্যায়ন হচ্ছে। একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ের পরে পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত আসবে।’

কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী তানভির বলেন, ‘আমরা ক্লাস করছি, কিন্তু স্যারদের খাতায় নাম নেই। ক্লাস শেষে চিরকুটে নাম ও রেজিস্ট্রেশন লিখে দিতে হচ্ছে। চিরকুট থেকে উপস্থিতি মূল্যায়ন হবে কি না জানা নেই। এগ্রি বিজনেস শিক্ষার্থীদের খাতায় নাম উঠেছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে দু-রকম নিয়নে কেন জানা নেই।’

আরও পড়ুন>> ৩ দিন পর স্বাভাবিক ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক, চলছে দূরপাল্লার

জানা গেছে, ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া এবং সেমিস্টার ফাইনালের এনরোলমেন্ট না করা উল্লেখ করে এ ১০ শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরপর পুনরায় ভর্তির জন্য ডিন এবং রেজিস্ট্রার দপ্তরে বহুবার যোগাযোগের ফলে রেজিস্ট্রার দপ্তর আশ্বাস দেয় নতুন ব্যাচ ভর্তি হলে তখন তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ার। তবে গত ২২ ফেব্রুয়ারি নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন এবং ক্লাস শুরুর বিজ্ঞপ্তির পর ২৪ ফেব্রুয়ারি তাদের পুনরায় ভর্তির আপডেট জানতে গেলে রেজিস্ট্রার দপ্তর কিছু জানে না বলে তাদের জানানো হয়।

এ বিষয়ে কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. পরিমল কান্তি বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুনরায় ভর্তির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত এবং অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আইন রয়েছে। নিয়মিত কোনো শিক্ষার্থী সেমিস্টার ফাইনালে ফেল করলে তিনি নতুন করে একই লেভেলে আবার ভর্তি হবেন। সাধারণত একটি সেমিস্টারে যেসব শিক্ষার্থীর উপস্থিতি প্রতিটি বিভাগে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ এবং সমন্বিত উপস্থিতি কমপক্ষে ৭০ শতাংশ থাকে শুধু তারাই সেমিস্টার ফাইনালের জন্য বিবেচিত হন। তবে কারও বিশেষ সমস্যা থাকলে সেটি উল্লেখ করে নির্দিষ্ট বিভাগে আবেদন করলে যদি সেই বিভাগ তাকে বিবেচনা করে তাহলে তিনিও পরীক্ষার জন্য বিবেচিত হবেন। এর বাইরে কেউ সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন না এবং তাকে একই সেমিস্টারে আবার ভর্তি হতে হবে।’

তবে লেভেল-১, সেমিস্টার-১ এর ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি ওই পরিমাণ উপস্থিতি নিশ্চিত না করেন কিংবা নির্দিষ্ট বিভাগ থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত না হন তাহলে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না এবং তার ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে। এরপরও যদি উক্ত লেভেলের কোনো শিক্ষার্থী পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেন তাহলে সেটি একাডেমিক কাউন্সিলে পাঠানো হয়। একাডেমিক কাউন্সিল যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত না দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত ওই শিক্ষার্থী অছাত্র হিসেবেই গণ্য হবেন।’

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এমন কয়েকটি আবেদন এসেছে। যাদের আবেদন পেয়েছি সবকটি একাডেমিক কাউন্সিলে পাঠিয়েছি। মিটিংয়ে যখন তাদের ব্যাপারে আলোচনা হবে, তখন আমি শিক্ষার্থীদের পক্ষেই বলবো।’

আরও পড়ুন>> একমাস পর ক্লাসে ফিরলেন ফুলপরী

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার শেখ রেজাউল করিম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে পুনরায় ভর্তির ব্যাপারে এমন নিয়ম নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের ৭১তম সভায় যে সব শিক্ষার্থীর ক্লাস উপস্থিতি ৭০ শতাংশের কম, তাদের লেভেল-১, সেমিস্টার-১ ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া এবং লেভেল-১, সেমিস্টার-১ ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারলে ছাত্রত্ব বাতিল করার সুপারিশ করা হয়। এবছর পুনরায় ভর্তির ব্যাপারে ২০ মার্চ একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং হবে। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত পজিটিভ আসতে পারে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালের উপাচার্য প্রফেসর ড. শহীদুর রশিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কিছু জানি না। এগুলো ডিন দেখবেন। আমাকে এসব সমস্যার কথা জানানো হয়নি। জানালে একাডেমিক কাউন্সিলে আলোচনা হবে।’

তাসনিম আহমেদ তানিম/ইএ/জেআইএম