প্রতিবন্ধী চার ছেলেকে দাদার কাছে রেখে প্রবাসে পাড়ি জমান বাবা। সেখানে বিয়ে করে দেশে ফেরার হদিস নেই। বৃদ্ধ দাদা চার প্রতিবন্ধী নাতিকে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন ভেঙে হেলে পড়া একটি কুড়েঘরে। সারাদিন দিনমজুরি করে যে আয় হয় চার নাতিকে নিয়ে খেয়ে বেচে চলছিলেন।
খবর পেয়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়ায় ‘বাউনবাইরার কতা’ নামে একটি সংগঠন। পরিবারটির জন্য টিনের ঘর তুলে দেয় তারা। সঙ্গে রান্নাঘর ও টয়লেটও। দেওয়া হয় শোয়ার খাট থেকে হাঁড়িপাতিল পর্যন্ত। ঘরের বাইরে বিশুদ্ধ পানির জন্য গভীর নলকূপ বসিয়ে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, পরিবারটিকে চারটি ছাগল দেওয়া হয়।
ঘটনাটি বেশ কয়েক বছর আগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘাটিয়ারার৷ শুধু এ কার্যক্রম দিয়ে থেমে থাকেনি বাউনবাইরার কতা নামের সংগঠনটি। ৮-৯ বছরে ছয়টি প্রজেক্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষকে স্বাবলম্বীর উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি। কেউ পেয়েছে দোকান, কেউ পেয়েছে গরু, আবার কেউ পেয়েছে রিকশা বা সেলাই মেশিন।
প্রতি বছর মানুষের পাঠানো জাকাতের টাকা দিয়ে হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেয় বাউনবাইরার কতা। এবছর ১১টি হতদরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বীর উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি।
বিজয়নগর উপজেলার আউলিয়া বাজারের কামালপুর গ্রামের মাওলানা আলী আহমদ। তার স্ত্রী ও চার সন্তানের পরিবার। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার পায়ে (কোমরের নিচের অংশ) সমস্যা ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সমস্যা আরও বাড়তে থাকে। একসময় পা দুটি প্রায় অচল হয়ে যায়। কোনোরকম লাঠি ভর করে ও মানুষের সাহায্য নিয়ে মাদরাসায় পাঠদান করতেন। একবার দাঁড়ানো অবস্থা থেকে দরজার চৌকাঠের ওপর পড়ে বাম পায়ের হাড় কোমরের নিচ থেকে ভেঙে যায়। আরও একবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গরুর শিংয়ের আঘাতে ডান পায়ের হাড়টাও ভেঙে যায়।
এ অবস্থায় মাদরাসায় শিক্ষকতা বাধ্য হয়ে ছাড়তে হয়। চাকরি ছাড়ার পর ওনার আয় রোজগারের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। নিম্ন আয়ের মানুষ মাওলানা আলী আহমদ বিভিন্নজনের সহযোগিতায় এবং নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে চিকিৎসা করেও কোনো সুফল পাননি। বর্তমানে পায়ে একটি স্ক্র্যাচার দিয়ে কোনোরকম নড়াচড়া করেন।
মাওলানা আলী আহমদ কিছু ছোট ছেলে মেয়েদের আরবি শেখান এবং ঘরে খুবই অল্প মালামালের একটি দোকান আছে। এ আয় দিয়ে তাদের ছয়জনের সংসার চলছে খুবই কষ্টে।
বিষয়টি জানতে পেরে বাউনবাইরার কতার সদস্যরা মাওলানা আলী আহমেদের শিশুদের আরবি পড়ানোর জন্য ছোট একটি মক্তবের ঘর তৈরি করে দেন। এতে আরও বেশি শিশুর আরবি শেখাতে পারবে। দোকানে আরও কিছু মালামাল কিনে দেওয়া হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরতলির ভাটপাড়া রেহেনা বেগম। অসুস্থ স্বামী শয্যাশায়ী। আছে চারটি ছোট সন্তান। জীবিকার তাগিদে রেহেনা মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। সবাইকে নিয়ে বসবাস করেন একটি টিনের ঘরে। ঘরের বাইরে রান্নাঘর আর বাথরুম। ওপরে চাল নেই আর বাথরুম কাপড় দিয়ে মোড়ানো। বৃষ্টি এলে রান্না বন্ধ। টাকার অভাবে এগুলো মেরামত করতে পারছেন না। ঘরের চালও নড়বড়ে।
এছাড়া বাড়িতে নলকূপ না থাকায় অন্যের বাড়ি থেকে পানি আনতে হয়। বিষয়টি জানতে পারে বাউনবাইরার কতা। রেহানার বসতঘর নতুন টিন দিয়ে মেরামত করে দেওয়া হয়। তৈরি করে দেওয়া হয় রান্নাঘর, স্থাপন করা হয় গভীর নলকূপ। ফুটেছে রেহেনার সংসারে হাসি।
এভাবে এ বছর ১১টি পরিবারের কেউ পেয়েছে নতুন ঘর, কাউকে মেরামত করে দেওয়া হয়েছে ঘর, দোকানের মালামাল, বেশ কিছু পরিবার পেয়েছে ছাগল, টিউবওয়েল, সেলাই মেশিন।
এছাড়া এ সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর দুই শতাধিক প্রবীণকে নতুন কাপড় এবং ঈদের দিনের সেমাই, দুধ ও চিনি উপহার দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বিকেলে আনুষ্ঠানিক ভাবে এসব বিতরণ করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. শাহগীর আলম।
বাউনবাইরার কতার অন্যতম অ্যাডমিন ডা. মাহবুবুর রহমান এমিল বলেন, প্রতিবছর মাসজুড়ে আমরা অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিয়ে থাকি। মাঝে করোনার মহামারিতে আমাদের কার্যক্রম স্থগিত ছিল। এবছর আমরা ১১টি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি।
তিনি আরও বলেন, বাউনবাইরার কতার ফেসবুক গ্রুপে এক লাখেরও বেশি সদস্য আছেন। প্রতিবছর রোজায় বেশিরভাগ জাকাতের অর্থ দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করেন গ্রুপের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। আমাদের ওপর আস্থা রেখে সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা প্রতিবছর তাদের জাকাতের টাকা প্রেরণ করে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমরা তাদের দেওয়া অর্থ সঠিক ও স্বচ্ছভাবে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছি।
আবুল হাসনাত মো. রাফি/এসজে/জেআইএম