কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অভিযান চালিয়ে পাহাড়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় চক্রের অন্যতম মূলহোতা হাফিজুর রহমান ওরফে ছালেহ ডাকাতসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছেন র্যাব-১৫ সদস্যরা। এসময় ডাকাত দলের সঙ্গে র্যাবের গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে।
শুক্রবার (৫ মে) দিনগত রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত টানা কয়েক ঘণ্টার অভিযান শেষে তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। শনিবার দুপুরে র্যাব-১৫ কক্সবাজার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গ্রেফতার ছালেহ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) অন্যতম নেতা।
গ্রেফতার অন্যরা হলেন ছালেহর সহযোগী নুরুল আলম নুরু (৪০), আক্তার কামাল সোহেল (৩৭), নুরুল আলম লালু (২৪), হারুনুর রশিদ (২৩) এবং রিয়াজ উদ্দিন বাপ্পি (১৭)।
গ্রেফতারকালে র্যাব সদস্যরা তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ১১টি দেশীয় তৈরি বন্দুক, ১৭ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, চার রাউন্ড খালি কার্তুজ, দুটি ছুরি ও ছয়টি দেশীয় তৈরি দা উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
খন্দকার আল মইন বলেন, গোপন তথ্যে খবর আসে টেকনাফের বাহারছড়া পাহাড়ি এলাকায় ছালেহ ডাকাতসহ তার গ্রুপ ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতে কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর অধিনায়কের নেতৃত্ব আভিযানিক দল পাহাড়ে অভিযানে যায়। ডাকাতদল র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। এসময় র্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। পরবর্তীকালে পাহাড়ি এলাকা ঘেরাও করে ছালেহ ডাকাত ও তার অন্য পাঁচজন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন, গ্রেফতারের পর পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে অবস্থান করে হাফিজুর রহমান ওরফে ছালেহ ডাকাতের নেতৃত্বে এ চক্রটি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়, মাদক ব্যবসাসহ অন্য অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তার এ দলে সদস্য সংখ্যা ১২-১৫ জন। সালেহর নেতৃত্বে এ দলটি টেকনাফের শালবাগান পাহাড়, জুম্মাপাড়া ও ন্যাচারাল পার্ক এলাকা, বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া পাহাড়, বড় ডেইল পাহাড়, কচ্ছপিয়া পাহাড়, জাহাজপুরা পাহাড়, হলবনিয়া পাহাড়, শিলখালী পাহাড় এলাকায় অবস্থান করে অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতো।
তিনি বলেন, তারা কখনো অটোরিকশাচালক এবং কখনো সিএনজিচালক হিসেবে ছদ্মবেশ ধরে বিভিন্ন কৌশলে কক্সবাজারের হ্নীলা, হোয়াইক্যং, উনচিপ্রাং, শ্যামলাপুর, জাদিমোড়া ও টেকনাফ এলাকার বাসিন্দাদের টার্গেট করে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও ডাকাতি করে আসছে।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতাররা জানান, ছালেহ ডাকাতের নেতৃত্বে গত ১৮ ডিসেম্বর টেকনাফের বাহারছড়া এলাকা থেকে ১০ জন কৃষক, ২ জানুয়ারি রোহিঙ্গা শরণার্থী রেজুয়ানা, ২৬ মার্চ ন্যাচারাল পার্কের দর্শনার্থী হ্নীলার দদমিয়ার বাসিন্দা কবির আহাম্মদের ছেলে রিদুয়ান সবুজ (১৭) ও একই এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আবুল কালামের ছেলে নুরুল মোস্তফা (১৬), ১৫ এপ্রিল ফুলের ডেইল এলাকা থেকে বাবুল মেম্বারের ছেলে ফয়সাল (১৭), ৩০ এপ্রিল হামিদুল্লাহ (২৪) এবং ৩ মে রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৭ ব্লক- ই/৬ এ বসবাসরত আবুল কালামসহ অনেক ব্যক্তিকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে ছেড়ে দেয় চক্রটি।
তারা আরও জানান, অপহৃত ব্যক্তিদের প্রতিজনের থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করতে তাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হতো। প্রাণনাশের হুমকির কারণে মুক্তিপণে ফেরত আসা অধিকাংশ ব্যক্তিই অপহরণকারীদের সম্পর্কে অভিযোগ দিতে বা মুখ খুলতে ভয় পেত। এখন পর্যন্ত এ দলটি প্রায় অর্ধশতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। তাছাড়া তারা মানবপাচার ও মাদক কারবারের সঙ্গেও জড়িত রয়েছে।
র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে উখিয়া ও টেকনাফ থানায় হত্যা, ধর্ষণ, মাদক, অপহরণ ও ডাকাতিসহ ডজনখানেক মামলা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হবে।
সায়ীদ আলমগীর/এমআরআর/এএসএম