তিন সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ২ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের কতিপয় ব্যয় স্থগিত/ হ্রাসকরণ ও বিদেশ ভ্রমণ সীমিতকরণের পরিপত্র জারি করে। পরিপত্র অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ব্যয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ৯ জুলাই এ নির্দেশনাকে সামনে রেখে ১০-৩১ জুলাই পর্যন্ত সব বিভাগের সব বর্ষের ক্লাস শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ। ১০ জুলাই যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন।
সূত্র জানায়, সব ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কয়েকদিন বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেন। সেসময় শিক্ষার্থীরা কৃচ্ছ্র সাধনের নির্দেশনা তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব এসি, লিফট ও এসি বাস চলাচল বন্ধেরও দাবি তোলেন। এরই মধ্যে ১৮ জুলাই যবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি অভিযোগ তোলে, ১৬ জুলাই কিছু শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নেন। একইসঙ্গে তারা সব ভবনের লিফট বন্ধ করে দেন। ১৮ জুলাই তারা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গাড়ি বন্ধ রাখতে বাধ্য করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওইদিন যবিপ্রবি শিক্ষক সমিতি জরুরি সভা করে ‘অপমান-লাঞ্ছনার তদন্তক্রমে সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত’ সব একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে, গত ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আহসান হাবীব সই করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২ আগস্ট (আজ বুধবার) থেকে সব ক্লাস সশরীরে অনুষ্ঠিত হবে। তবে ক্লাস শুরু হয়নি। এতে প্রায় তিন সপ্তাহ ক্লাস না হওয়ায় সেশনজটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সোহেল রানা বলেন, অনলাইনে ক্লাসের ঘোষণার পর শিক্ষকরা গাড়ির চাবি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলে ক্লাস বর্জন করেছেন। ফলে প্রায় তিন সপ্তাহ ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা উদ্বিগ্ন। তারা সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের গাড়ির চাবি কারা কেড়ে নিয়েছে তা তিনি জানেন না। অনলাইন ক্লাসের প্রতিবাদে যারা আন্দোলন করেছিলেন, তাদের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
বিশ্ববিদ্যািলয় সূত্র বলছে, অনলাইনে ক্লাসের ঘোষণা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভও করেছেন তারা। এর আগে যবিপ্রবির কয়েকটি ভবনে লিফট স্থাপনের দাবিতেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। ওই সময় উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে লিফট স্থাপনের আশ্বাস দেন। কিন্তু অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় সেই লিফট স্থাপন কার্যক্রম শুরু হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীরা লিফটের দাবিতে আন্দোলনে নামতে পারেন, এ আশঙ্কায় ঘটনা ভিন্নখাতে নিতে উপাচার্যঘনিষ্ঠ শিক্ষকরা ক্লাসবর্জন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এ বিষয়ে যবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গালিব বলেন, ‘কিছু শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এতে শিক্ষকরা অপমানিত হয়েছেন। অপমান-লাঞ্ছনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষকরা ক্লাসে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছেন।’
লিফট বা অন্য কোনো বিষয় এ আন্দোলনের পেছনে রয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমন কোনো বিষয় তার জানা নেই।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লিফট ও বাস বন্ধ করে দেয়। যাতে শিক্ষকরা অপমানিত হয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন। চিকিৎসাজনিত কারণে দেশের বাইরে ছিলেন উল্লেখ করে উপাচার্য আরও বলেন, বৃহস্পতিবার (১০ আগস্ট) তিনি ক্যাম্পাসে ফিরবেন। এরপর বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধান করে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেবেন।
মিলন রহমান/এসআর/জিকেএস