বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অসাধারণ জনপ্রিয় একজন রাজনৈতিক নেতা। দলীয় কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন মুজিব ভাই, অপরাপর রাজনৈতিক সহকর্মীদের শেখ সাহেব। বিরল নেতৃত্ব গুণের কারণে ঊনসত্তরের মহান গণআন্দোলনের পর তিনিই বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। একজন রাজনীতিক বা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর বলিষ্ঠতার কাহিনী সর্বজনবিদিত। একজন মানুষ হিসেবে তিনি কতটা হৃদয়বান ছিলেন তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর দীর্ঘ রাজবন্দী জীবনে কারাগার থেকে পিতা, নেতা, স্ত্রী প্রমুখের কাছে লেখা কয়েকটি চিঠি থেকে। জেল থেকে লেখা সব চিঠি সেন্সর হয়, তার চিঠিগুলোও বাদ যায়নি; ফলে যাঁদের উদ্দেশে চিঠিগুলো লেখা হয়েছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলো সে সময় তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। পরবর্তী সময়ে চিঠিগুলো সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফাইল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
মাত্র কয়েকটি চিঠি উদ্ধৃত করে হৃদয়বান মানুষ শেখ মুজিবকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
এটা প্রায় সবারই জানা যে ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৯ সাল- এই সময়কালের একটা বড় অংশ শেখ মুজিবকে বন্দী জীবন কাটাতে হয়েছে। ১৯৫০ সালে ফরিদপুর জেলে আটক থাকাকালে ২১.১২.৫০ তারিখে তার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে লেখা একটি বাজেয়াপ্ত (প্রাপকের কাছে প্রেরিত না হওয়া) নিচে উদ্ধৃত করছি। চিঠিটি ইংরেজিতে লেখা ছিল। বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। চিঠিটিতে তরুণ রাজবন্দী শেখ মুজিবের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় মেলে-
জনাব সোহরাওয়ার্দী সাহেব,
আপনার প্রতি সালাম রইল। শুনে খুব খুশি হয়েছি যে, মওলানা সাহেব কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন, তিনি রক্তচাপ ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। গত নভেম্বরে গোপালগঞ্জের আদালতে তোলার জন্য আমাকে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে আনা হয়েছিল। আমাকে আবার ফরিদপুর কারাগারে নেওয়া হয়, কারণ নিরপত্তা বন্দিদের জন্য সাব-জেলে স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। আমাকে এখন ফরিদপুর কারাগার থেকে মামলার প্রতিটি তারিখে হাজিরা দিতে হবে। ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জে একবারের যাত্রায় ৬০ ঘণ্টা সময় লেগে যায় এবং যে পথে যেতে হয় ও সাধারণত যে যানবাহনে চড়তে হয়, তা দীর্ঘদিন থেকেই মানুষের কাছে ক্লান্তিকর। আমি জানি না কতদিন এই মামলা চলবে।
যাহোক, এ বিষয়ে আমি ভ্রুক্ষেপ করি না। আব্দুস সালাম সাহেব আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ফরিদপুর কারাগারে এসেছিলেন। তিনি হাইকোর্টে আমার হেবিয়াস কার্পাস আবেদন উপস্থাপন করবেন। পাকিস্তানের ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা যে, মসজিদের ভেতর ঢুকে পুলিশ মানুষকে ছত্রভঙ্গ করতে লাঠি ব্যবহার করেছে। আমার জন্য চিন্তা করবেন না প্লিজ। আমি জানি, যারা আদর্শের জন্য মরতে প্রস্তুত থাকে, তারা কদাচিৎ পরাজিত হয়। মহৎ আত্মত্যাগের মাধ্যমেই মহৎ কিছু অর্জন করা যায়। আল্লাহ যে কারও চেয়ে বেশি শক্তিমান এবং আমি তাঁর কাছ থেকে ন্যায়বিচার চাই।
আপনার দিনকাল কেমন যাচ্ছে? আমি বুঝতে পারি আপনি খুব ব্যস্ত। গত অক্টোবরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে আমাদের যখন দেখা হয়েছিল, আপনি অনুগ্রহ করে কথা দিয়েছিলেন আমার জন্য কিছু বই পাঠাবেন। আমি এখন পর্যন্ত কোনো বই পাইনি। আপনার ভুলে গেলে চলবে না, আমি এখন একাকী জীবনযাপন করছি এবং বই-ই একমাত্র আমার সঙ্গী। যাহোক, আমার দিন চলে যাচ্ছে। আপনার স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ যত্ন নেবেন প্লিজ।
আপনার স্নেহধন্য
মুজিবুর
উদ্ধৃত পত্রে তরুণ রাজবন্দী শেখ মুজিবুর রহমান মহৎ উদ্দেশ্য সাধনে ত্যাগ স্বীকার এবং প্রয়োজনে মৃত্যুবরণের জন্য তৈরি থাকার কথা বলেছেন, কারণ তাতে কখনো পরাজয় হয় না বরং মহৎ ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমেই মহৎ কর্ম সম্পাদিত হয়। এমন উচ্চারণ যে তিনি অযথা করেননি, তা তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। চিঠির শেষাংশে কিছু গ্রন্থের জন্য তার আকুতি শেখ সাহেবের গ্রন্থপ্রিয়তারই পরিচায়ক। দীর্ঘ বন্দীজীবনে গ্রন্থই ছিল তার বিশ্বস্ত সঙ্গী।
ঢাকা জেল থেকে ১২.১১.৫৮ তারিখে পিতা শেখ লুৎফর রহমানকে লেখা বঙ্গবন্ধুর বাজেয়াপ্ত চিঠি থেকে উদ্ধৃতি :
আব্বা,
আমার ভক্তিপূর্ণ ছালাম গ্রহণ করবেন ও মাকে দিবেন। মা এবার খুব কষ্ট পেয়েছিল, কারণ এবার তার সামনেই আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দোয়া করবেন মিথ্যা মামলায় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমাকে ডাকাতি মামলার আসামিও একবার করেছিল। আল্লাহ আছে, সত্যের জয় হবেই। আপনি জানেন বাসায় কিছুই নাই। দয়া করে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি যেতে বলে দিতাম। কিন্তু ওদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে আবার রাজবন্দী করেছে, দরকার ছিল না। কারণ রাজনীতি আর নাই এবং রাজনীতি আর করব না। সরকার অনুমতি দিলেও আর করব না। যে দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আমি ঘুষ খেতে পারি সে দেশে কোনো কাজই করা উচিত না। এদেশে ত্যাগ ও সাধনার কোনো দামই নাই । যদি কোনোদিন জেল হতে বের হতে পারি তবে কোনো কিছু একটা করে ছেলেমেয়ে ও আপনাদের নিয়ে ভালোভাবে সংসার করব। নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি। বাড়ির সকলকে আমার ছালাম দিবেন। দোয়া করতে বলবেন। আপনার ও মায়ের শরীরের প্রতি যতœ নিবেন। চিন্তা করে মন খারাপ করবেন না। মাকে কাঁদতে নিষেধ করবেন। আমি ভালো আছি।
পুনশ্চ: গোপালগঞ্জের বাসাটা ভাড়া দিয়া দেবেন। বাসার আর দরকার হবে না।
আপনার স্নেহের, মুজিব
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন কায়েমের পর পূর্ববাংলার মুসলিম লীগ বহির্ভূত প্রায় সব রাজনৈতিক নেতাকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। আটক রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুও ছিলেন। জেল থেকে বাবাকে লেখা ওই চিঠিতে মায়ের সামনে গ্রেপ্তারে মায়ের কষ্টে বেদনা এবং মিথ্যা মামলায় চরম ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে। চিঠির একটি অংশ অত্যন্ত বেদনাদায়ক ‘আপনি জানেন বাসায় কিছুই নাই। দয়া করে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি যেতে বলে দিতাম কিন্তু ওদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাবে।’
রাজনীতিক শেখ মুজিব একদিকে ছিলেন দেশের স্বার্থের প্রশ্নে কঠিন এবং আপোসহীন, অপরদিকে পরিবার ও সতীর্থদের জন্য কোমল একজন মানুষ। কঠিন ও কোমলের মিশ্রণে গড়া শেখ মুজিবের সবচাইতে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মানুষের মতো মানুষ।
কারাবন্দি শেখ মুজিবের মায়ের কষ্টের জন্য বেদনা এবং ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষতির আশঙ্কায় আকুলতা একজন পিতৃমাতৃভক্ত সন্তান এবংস্নেহপ্রবণ পিতার পরিচয় তুলে ধরে। চিঠির দ্বিতীয় অংশে রাজনীতির প্রতি যে বিতৃষ্ণা তা বস্তুতপক্ষে সামরিক শাসনে দেশে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে বিবেচ্য। মিথ্যা মামলায় ক্ষোভের প্রকাশও পত্রে স্পষ্ট, বিশেষত এই দুটি বাক্য লক্ষণীয়- ‘এদেশে ত্যাগ ও সাধনার কোনো দামই নাই’ এবং ‘নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি।’ এই চিঠিটি অবশ্য বঙ্গবন্ধুর পিতা পাননি কারণ সম্ভবত সামরিক শাসনে দেশে রাজনৈতিক এবং রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ থাকায়।
বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় চিঠিটি ঢাকা জেল থেকে ১৬.৪.৫৯ তারিখে তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা, ডাকনাম রেনুকে লেখা :
রেনু,
আমার ভালোবাসা নিও। ঈদের পরে আমার সাথে দেখা করতে এসেছো ছেলেমেয়েদের নিয়ে আস নাই। কারণ তুমি ঈদ করো নাই। ছেলেমেয়েরাও করে নাই। খুবই অন্যায় করেছো। ছেলেমেয়েরা ঈদে একটু আনন্দ করতে চায়। কারণ সকলেই করে। তুমি বুঝতে পারো ওরা কত দুঃখ পেয়েছে। আব্বা ও মা শুনলে খুবই রাগ করবেন। আগামীতে দেখার সময় ওদের সকলকে নিয়ে আসিও। কেন যে চিন্তা করো বুঝি না। আমার কবে মুক্তি হবে তার কোন ঠিক নাই। তোমার একমাত্র কাজ হবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখানো। টাকার দরকার হলে আব্বাকে লেখিও, কিছু কিছু মাসে মাসে দিতে পারবেন। হাছিনাকে মন দিয়ে পড়তে বলিও। কামালের স্বাস্থ্য মোটেই ভালো হচ্ছে না। ওকে নিয়ম মতো খেতে বলিও। জামাল যেন মন দিয়ে পড়ে আর ছবি আঁকে। এবার একটা ছবি এঁকে যেন নিয়ে আসে আমি দেখব। রেহানা খুব দুষ্ট ওকে কিছুদিন পরে স্কুলে দিয়ে দিও জামালের সাথে। যদি সময় পাও নিজেও একটু লেখাপড়া করিও।
....ইতি, তোমার মুজিব
স্ত্রীর কাছে জেল থেকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠিতে ছেলেমেয়েদের জেল গেটে নিয়ে না যাওয়া, ঈদ না করার জন্য অনুযোগ, প্রতিটি ছেলেমেয়ের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ সর্বোপরি নির্দেশ, ‘তোমার একমাত্র কাজ হবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখানো’ একজন আদর্শ স্বামী ও পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর চরিত্র তুলে ধরে। তিনি বন্দি অবস্থাতেও যে পরিবার নিয়ে কতটা চিন্তিত ছিলেন, তা থেকে বোঝা যায় তিনি কতটা পারিবারিক ছিলেন।
ঢাকা জেল থেকে ১৯.৮.৬৬ তারিখে রাজনৈতিক সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদকে লেখা একটি সংক্ষিপ্ত চিঠিতে তিনি লিখেছেন :
স্নেহের তাজুদ্দিন,
আমার স্নেহ ও ভালোবাসা নিও। কেমন আছ? খবর জানি না। আমাকে খবর দিও। চিন্তা করিও না। সকলকে ছালাম দিও। শরীরটা বেশি ভালো না, তবে কেটে যাচ্ছে। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিও।
ইতি, তোমার মুজিব ভাই
সংক্ষিপ্ত একটি চিঠি কিন্তু বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মীর প্রতি অকুণ্ঠ স্নেহ ও ভালোবাসার প্রকাশ। এভাবেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন নেতৃত্ব ও বিশ্বস্ত কর্মীবাহিনী। শেষ যে ভিত্তি উদ্ধৃত করছি, সেটি তার জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনাকে লেখা। শেখ হাসিনা তখন স্বামীর সঙ্গে ইতালি প্রবাসী। ১৩.৬.৬৯ তারিখে ঢাকা থেকে লেখা চিঠিটি :
হাছু মনি,
আমার স্নেহ ও ভালোবাসা নিও। ওয়াজেদের চিঠি পেয়েছিলাম, উত্তর দিয়েছি বোধহয় পেয়ে থাকবে। জেল হতে বের হয়ে তোমাকে ভালো করে দেখতেও পারি নাই। শুধু তোমার শরীরের দিকে চেয়ে তোমাকে যেতে দিয়েছি। শরীরের প্রতি যত্ন নিও। ওয়াজেদের শরীর কেমন। আমরা সকলেই ভালো আছি। চিন্তা করে শরীর নষ্ট করিও না। বোধহয় শুনেছ মানিক ভাই পিন্ডিতে হঠাৎ মারা গিয়েছেন। বুঝতেই পার আমার অবস্থা। প্রফেসর হাই সাহেবও মারা গিয়েছেন। বাংলাদেশের দুইজন কৃতী সন্তান আমরা হারালাম। চিন্তা করিও না । সুইডেন খুব সুন্দর দেশ। তোমাদের খুব ভালো লাগবে। চিঠি দিও ।
তোমার আব্বা
স্নেহের কন্যাকে লিখিত চিঠিতে পিতার আকুতি ‘জেল হতে বের হয়ে তোমাকে ভালো করে দেখতে পারি নাই।’ ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল হাইয়ের মৃত্যুতে শোকাহত বঙ্গবন্ধুর ব্যথা ছোট চিঠিটির ছত্রে ছত্রে পরিস্ফুট।
যে কয়টি চিঠি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হলো, তার মধ্য দিয়ে মানুষ মুজিবের যে অন্তরঙ্গ পরিচয় ফুটে ওঠে, তা থেকে বোঝা যায় রাজনীতিক শেখ মুজিব একদিকে ছিলেন দেশের স্বার্থের প্রশ্নে কঠিন এবং আপোসহীন, অপরদিকে পরিবার ও সতীর্থদের জন্য কোমল একজন মানুষ। কঠিন ও কোমলের মিশ্রণে গড়া শেখ মুজিবের সবচাইতে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন একজন মানুষের মতো মানুষ ।
১৪ আগস্ট, ২০২৩ [২]
লেখক: রাজনীতিক, লেখক ও মহাপরিচালক, বিএফডিআর।
এইচআর/জিকেএস