যুক্তরাজ্যের মাটিতে বিক্ষোভের কারণে দায়ের হওয়া মামলায় ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভুত নাগরিক ও অভিবাসীদের ফাঁসাতে ব্রিটিশ আদালতকে প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। মামলাসংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ঘেঁটে রোববার (২০ আগস্ট) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের অস্ত্র ব্যবসার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ফিলিস্তিনিপন্থী অ্যাকটিভিস্টদের সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ এর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় আদালতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। প্যালেস্টাইন অ্যাকশন বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলি অস্ত্র কারখানাগুলোর সামনে বিক্ষোভ করে থাকে।
আরও পড়ুন: পশ্চিমতীরে বন্দুকধারীর হামলায় ২ ইসরায়েলি নিহত
সম্প্রতি সংগঠনটি ‘তথ্য প্রাপ্তির স্বাধীনতা (এফওআই)’ আইনের মাধ্যমে মামলাসংক্রান্ত নথিগুলো প্রকাশের অনুরোধ জানায়। ওই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি হস্তান্তর করেন আদালত।
সম্প্রতি নাকবা দিবসে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসলে অবস্থিত ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের মালিকানাধীন পিয়ারসন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন। সে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় ইসরায়েলি দূতাবাস যুক্তরাজ্যের আদালতে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছিল। মূলত ব্রিটিশ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে প্রভাবিত করতে চেয়েছিল নেতানিয়াহুর দেশটি।
মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের পরিচালক ডগলাস উইলসনকে চাপ প্রয়োগ করেছিল ইসরায়েলি দূতাবাস। তবে প্রকাশিত নথিগুলো ব্যাপক সংশোধন করায় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ঠিক কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন: ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি হামলাকে ‘সন্ত্রাস’ বললো যুক্তরাষ্ট্র
ইসরায়েলি দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ডগলাস উইলসনের বৈঠকের পর তার পাঠানো একটি ই-মেইল বার্তায় দেখা যায়, ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (সিপিএস) তাদের বিচারকার্যের সিদ্ধান্ত ও বিচারকাজ স্বাধীনভাবে পরিচালনা করে। কোনো সরকারি বা বিদেশি কর্মকর্তা কোনো মামলায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।
গত বছরের মে থেকে ই-মেইলে ইসরায়েলি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত পুলিশি কর্মকাণ্ড, অপরাধ, আদালত ও সাজাসংক্রান্ত আইনের বিষয়ে রাজকীয় সম্মতি থাকার বিষয়টিও জানান উইলসন। এমনকি, সেখানে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের বিক্ষোভের অধিকারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে এমন পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকরা সিদ্ধান্ত নেন, যেসব বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, বিচারকার্য চলাকালীন তাদের মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে না। আর এর মাধ্যমে প্রতিবাদ করার অধিকারকে আরও সীমিত করে দেওয়া হবে। বিচারকদের এমন সিদ্ধান্তের ফলে মানবাধিকার সুরক্ষা আইনের আওতায় প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের যেসব বিক্ষোভকারী খালাস পেতেন, তারা এখন দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: ফিলিস্তিনকে বড় ছাড় না দিলে সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি সম্ভব নয়
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের পক্ষে লড়াই করা আইনজীবী লিডিয়া ড্যাগোস্টিনো বলেন, সংগঠনটির বিক্ষোভসংক্রান্ত মামলাগুলো প্রভাবিত করার কতটা চেষ্টা হয়েছে, তা নিয়ে সুস্পষ্ট তদন্ত হওয়া দরকার।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে এক ইসরায়েলি ব্যক্তিকে গ্রেফতারের বিষয়েও দূতাবাস কর্মকর্তা ও উইলসনের মধ্যে চিঠি চালাচালি হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার ইসরায়েলের অনুরোধেই ওই চিঠিগুলোর প্রস্তাবে ব্যাপক সংশোধন আনা হয়েছে। তবে ২০০৯ সালে ইসরায়েলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপি লিভনিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন ব্রিটিশ আদালত। তবে পরবর্তী সময়ে লিভনির বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানা তুলে নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রিটিশ অ্যাটর্নি জেনারেল উইলসন বলেন, এখন কাউকে গ্রেফতার করতে হলে পাবলিক প্রসিকিউশনের অনুমতি বা সম্মতি লাগে। তাই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি আগের থেকে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বিশেষ মিশন দায়মুক্তির জন্য পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও ডেভেলপমেন্ট অফিসে আবেদন করতে পারে। এর আগে লিভনিকে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
আরও পড়ুন: আদালতের ক্ষমতা কমানোর পরিকল্পনায় এক ধাপ এগোলেন নেতানিয়াহু
এদিকে, নথির বিষয়ে জানতে চাইলে ইসরায়েলি দূতাবাসের মুখপাত্র দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, আমরা যুক্তরাজ্যের বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সম্মান করি। ইসরায়েল কোনো অবস্থাতেই যুক্তরাজ্যের আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করবে না। তবে যুক্তরাজ্যসহ সারাবিশ্বে অবস্থানকারী ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রতি খেয়াল রাখা ও সহায়তা করা আমাদের দূতাবাসগুলোর দায়িত্ব।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান
এসএএইচ