দরপত্রের মাধ্যমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করার দায়িত্ব পেয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বিল্লাল এন্টারপ্রাইজ। এর বিনিময়ে প্রতিটি বাসা থেকে ১০০ টাকা করে নেয় তারা। কিন্তু বাড়িওয়ালাদের অভিযোগ, প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিলেও বাসাবাড়ি থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করেন না তারা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
আরামবাগ, ফকিরাপুল, ফকিরাপুল বাজার এলাকা, মতিঝিল সি/এ, দিলকুশা সি/এ, বঙ্গভবন এলাকা নিয়ে ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সপ্তাহে গড়ে দু-তিন দিন গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহ করেন ডিএসসিসির অনুমোদিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজন। বাকি দিনগুলোতে বর্জ্য বাসায় স্তূপ করে রাখতে হয়। অনেকে দুর্গন্ধে টিকতে না পেরে বর্জ্য গলি, রাস্তায় ফেলছেন তারা। এতে এলাকার পরিবেশ নোংরা হচ্ছে।
ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে আরামবাগ, ফকিরাপুল ও ফকিরাপুল বাজার এলাকা আবাসিক। আর মতিঝিল সি/এ ও দিলকুশা এলাকা বাণিজ্যিক। শনিবার (৯ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকার রাস্তাঘাট ও ফুটপাত অনেকটাই অপরিষ্কার। স্বচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছেন পথচারী ও যাত্রীরা। কিন্তু আরামবাগ, ফকিরাপুল এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। এই এলাকার গলিগুলো খুবই সরু। প্রতিটি গলিতেই গৃহস্থালির বর্জ্য ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে কোথাও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন: ভাঙা রাস্তায় হাঁটু পানি, দুর্ভোগে চালক-যাত্রী
এরমধ্যে আরামবাগ মগা গলির অবস্থা সবচেয়ে বেশি নোংরা। এই গলির বিভিন্ন স্থানে গৃহস্থালির বর্জ্য ছড়িয়ে আছে। এরমধ্যে ৬৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের এক কোণে ময়লা স্তূপ হয়ে আছে। যদিও যেখানে ময়লার স্তূপ, সেখানেই লেখা রয়েছে ‘এখানে ময়লা ফেলা নিষেধ।’
মগা গলির ৭৯/এ হোল্ডিয়ের বাসিন্দা ফারুক আলম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আগে সিটি করপোরেশনের লোকজন নিয়মিত বর্জ্য নিয়ে যেত। কিন্তু এখন যারা বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ করেন না। তাদের লোকজন একদিন এলে তিন দিন খবর থাকে না। যেমন, গত মাসে গড়ে ১০ দিন বর্জ্য নিয়েছে, ২০ দিন নেয়নি। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত দুদিন বর্জ্য নিছে। অথচ মাস শেষ হওয়ার আগেই প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে ১০০ টাকা করে নিচ্ছে তারা।
মগারগলির মো. রবীন বলেন, আমরা আসলেই বর্জ্য নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। মাসে মাসে টাকা দেই ঠিকই কিন্তু বাসার ময়লা নিয়মিত নেয় না। দুর্গন্ধে বাসায় থাকা যায় না। তিন-চারদিনের বাসার ময়লা সবাই রাস্তায় ফেলে যায়। বর্জ্যের দুর্গন্ধে রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না।
ফকিরাপুল বাজার গলির অবস্থা আরও করুণ। এ গলির বিভিন্ন স্থান ও বাজারের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা হায়দার আলী বলেন, যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেয়েছে, তারা নিয়মিত বর্জ্য নেয় না। বিষয়টি স্থানীয় কাউন্সিলরকে একাধিকবার জানালেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
তিনি বলেন, যখন ঠিকাদার বর্জ্য না নেয়, সে বর্জ্য থেকে একদিন পরই দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। অনেকে বাধ্য হয়ে সে বর্জ্য রাস্তায় ফেলে দেন। এতে সড়কে চলাচল করার সময় বাতাসে দুর্গন্ধ আসে।
আরও পড়ুন: কেউ না এলেও একাই ভাঙা রাস্তা সারছেন ভ্যানচালক
হায়দার আলীর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন একই এলাকার বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আরামবাগ-ফকিরাপুলের গলি, রাস্তা নোংরা হলেও মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার চিত্র ভিন্ন। বাণিজ্যিক এ দুটি এলাকার বহুতল ভবন থেকে ঠিকই নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজন। সেখানের প্রতিটি অফিস থেকে মাসে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত নেয় তারা। তাই বাণিজ্যিক এই এলাকা দুটিতেই তারা বেশি গুরুত্ব দেয়।
ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয় সূত্র জানায়, গত আগস্টে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বর্জ্য সংগ্রহে দরপত্র আহ্বান করে ডিএসসিসি। দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা (১২ লাখ টাকা) হয় বিল্লাল এন্টারপ্রাইজ। এর আগের বছরও তারা সর্বোচ্চ দর দিয়ে এ ওয়ার্ডের বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেয়েছিল।
তবে বর্জ্য সংগ্রহে নাগরিকদের এই অভিযোগের বিষয়ে বিল্লাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বিল্লাল হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, অনিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। তারা সব বাসা থেকেই নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করেন। গলি বা রাস্তার কোথাও কোনো বর্জ্য স্তূপ হয়ে থাকে না।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে বাড়ির বাসিন্দাদের ময়লা নিচে রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু বাসিন্দারা বাড়ির নিচে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা রাখে না। পাঁচ-সাত তলা উঠে ময়লা আনতে হয়। এরমধ্যে মেসগুলোর ময়লা সংগ্রহে সবচেয়ে সমস্যা হয়। দেখা যায়, আমরা যখন ময়লা আনতে যাই, মেসের লোকজন রুমে থাকে না। তাই প্রত্যেকে বাসার নিচে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা রাখলে ভালো হয়।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. মোজাম্মেল হক জাগো নিউজকে বলেন, আমার ওয়ার্ডের মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু তারা যদি রাতে তরকারি কাটেন, সেই ময়লা আমরা কীভাবে নেবো? আমার ওয়ার্ডের মানুষই সচেতন না। তারপরও কোথাও থেকে যদি সিটি করপোরেশনের লোকজন ময়লা না নেয়, সেটি আমাকে জানাতে বলছি। তারা সেটা করে না।
তিনি বলেন, আমার ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করতে একটি প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন থেকে দরপত্রের মাধ্যমে অনুমোদন পেয়েছে। এখন তারা নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু অনেকেই তাদের টাকা দিতে চায় না। তাই হয়তো কিছু বাসার বর্জ্য তারা সংগ্রহ করেন না। আমি আহ্বান জানাবো, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার পরও যদি ঠিকাদার বর্জ্য না নেয়, বাসিন্দারা যাতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
এমএমএ/এমএইচআর/এমএস