৮ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করা অবস্থায় দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। ৯ নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক সেনাপতি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী (এমএজি ওসমানী) এসে নিজ হাতে আমাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। কিন্তু যিনি দেশ স্বাধীনতার জন্য এতো বড় অবদান রাখলেন আজ তার নাম দায়সারাভাবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। এটাই আমাদের দুঃখ। ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বারান্দায় ক্র্যাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন এক বৃদ্ধ। নাতি তার প্রতিবন্ধী। জেলা সমাজসেবা অধিদফতর থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য আসছিলেন জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ নিতে। এ সময় বারান্দায় বসেই কথা হয় এই বৃদ্ধের সঙ্গে। নাম তার রঘুনাথ মৃধা। বাড়ি সদর উপজেলার ভীমরুলী গ্রামে। রঘুনাথ মৃধা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে ৮ম শ্রেণিতে পড়াশুনা করি। মে মাসে শুনতে পাই পাকিস্তানিরা আক্রমণ করেছে। ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমর আমাদের দেশ স্বাধীনের জন্য সহযোগিতার ডাক দিলেন। তখন তিনি সাবসেক্টর কমান্ডার। তার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা বিভিন্ন বয়সী শ’ খানেক লোক হলাম। দেখলাম বড় বড় গোঁফ নিয়ে একজন এসে আমাদের ট্রেনিং দেয়া শুরু করলেন। বাঁশের লাঠি দিয়ে বারুহার ও শেখেরহাট স্কুল মাঠে তিনি আমাদের ট্রেনিং দিলেন। তার খাওয়া দাওয়া ট্রেনিংয়ের স্থানের কাছে যাদের বাড়ি ছিলো তারাই করাতো। আমিও মাঝে মধ্যে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতাম। ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমরের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানি উনি আমাদের সেনাপতি ওসমানী সাহেব। প্রশিক্ষণ শেষ হলে আমরা যুদ্ধে নেমে পড়ি। একে অল্প বয়স তারপর আবার স্বশস্ত্র যুদ্ধ। এজন্য প্রথমে ভয় পেয়ে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতাম বেশি। মাস খানেক পরে সাহস হলো। শতদশকাঠি, ভীমরুলী, আটঘর, কুড়িয়ানা, স্বরূপকাঠি, বানারীপাড়া, শ্রীমন্তকাঠি, কুতুবকাঠি ও নান্দিকাঠিতে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ১৩ ভাদ্র মঙ্গলবার সারাদিন তুমুল ঝড় ও মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টিতে চারিদিক অন্ধকার। ৭ জন পাকহানাদার পথ হারিয়ে কুতুবকাঠি স্কুলে আশ্রয় নেয়। আমরাও কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পায়। ১০৮ জন মুক্তিযোদ্ধা দলগতভাবে আক্রমণ করি। কিন্তু ওদের ভারী অস্ত্রের মোকাবেলা করার মত আমাদের কোন অস্ত্র ছিল না। আমরা রণকৌশল ঠিক করে একটা গুলি করে বিরত নিই আর ওরা অনেক গুলি করে। এ সময় একটি গুলি এসে আমার ডান পায়ে লেগে আহত হই। এভাবে ভোর পর্যন্ত গোলাগুলির এক পর্যায়ে পাকহানাদারদের গুলি শেষ হয়ে যায়। আমরা ওদের আটক করি।পারিবারিক বিষয়ে রঘুনাথ বলেন, বসতভিটা ছাড়া বাড়তি পৈত্রিক ভিটেমাটি মোটেও নেই। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ২ জনে বাড়ি থেকে আলাদা থাকে। ছোট ছেলে দিন মজুর ও ছোট মেয়ে ভোলা নার্সিং ইনস্টিটিউটে পরিচ্ছন্ন কর্মীর চাকরি করেন। মাসিক মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ও মেয়ের দেয়া খরচেই চলতে হয়। এসএস/আরআইপি