দেশজুড়ে

প্রতিবন্ধী লাল মিয়ার নৌকাতেই ভাসমান সংসার

প্রতিবন্ধী লাল মিয়ার (৪৫) মা বাবা ভাইবোন কয়েক যুগ ধরে নিখোঁজ। স্ত্রী খালেদা বেগম আর তিন সন্তান নিয়েই তার জগৎ সংসার। খেয়াঘাটে নৌকায় যাত্রী পারাপার করে পাঁচ সদস্যের ভরণপোষণ চলে। বসতির জমিজমা নাই। তাই নৌকাতেই তার ভাসমান সংসার।ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার আমূয়া বন্দর খেঁয়াঘাটের মাঝি প্রতিবন্ধী লাল মিয়া নৌকার ওপর ঘর বানিয়ে জীবনযাপন করছেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার আমূয়া গ্রামের কৃষক বাবুল হাওলাদারের বসতঘর লাগোয়া পতিত জমিতে ১৭ ফুট দৈর্ঘ্য একটি কাঠের নৌকার ওপর কাঠ ও টিনের নির্মিত তিন কক্ষ বিশিষ্ট একটি ঘরে লাল মিয়ার সংসার। ভূমিহীন লাল মিয়ার এই সমাজে যেন যাযাবরের মত জীবন।   তিনি জানান, বরিশালের বাখরগঞ্জ উপজেলার শিয়ালগুনি গ্রামে তার পৈত্রিক নিবাস ছিল। তার বাবার নাম মালেক হাওলাদার। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে লাল মিয়াই কেবল প্রতিবন্ধী। এ কারণে পরিবারের অবহেলা আর সমাজের উপেক্ষা ছিল। তার পরিবার বরিশাল শহরের এক বস্তিতে বসবাস করতেন। দিনমজুর বাবার পক্ষে এত সদস্যের ভরণপোষণ চালানো বেশ কষ্ট সাধ্য ছিল। এর মধ্যেই সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন লাল মিয়া। পরে স্কুল ছেড়ে ১৪ বছর বয়সে লাল মিয়া প্রতিবেশী এক ট্রাক ড্রাইভারের সঙ্গে ভারতে যান। সেখানে ২-৩ বছর থেকে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত দেশে ফিরে তিনি বরিশালের সেই বস্তিততে তার পরিবারের কাউকে খুঁজে পান নি। বস্তির কেউ বলতে পারে না তার পরিবারের লোকজন কোথায় গেছে। পরে বরগুনার বেতাগী উপজেলার সদরে একটি পাবলিক টয়লেট তদারকির কাজ পান। পাশাপাশি বিষখালী নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। এমন অবস্থায় কাঁঠালিয়ার আমূয়া বন্দরের দিনমজুর আ. খালেকের মেয়ে খালেদাকে বিয়ে করেন। এরপর পাবলিক টয়লেটের কাজ ছেড়ে গত দুই বছর ধরে আমূয়া বন্দর খেয়াঘাটে নৌকায় যাত্রী পারপার করে আসছেন। নিজের বসতির জমি না থাকায় ১৭ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি নৌকার ওপর ২৫ হাজার টাকা ব্যায় করে তিন কক্ষের একটি ঘর বানিয়ে ভাসমান সংসার চলছিল। জলে ভাসমান সংসারে ঘটে দুঃখজনক ঘটনা। একদিন রাতে ঘুমের ঘোরে পাঁচ বছর বয়সি সাগর নামের প্রথম ছেলে সন্তান নৌকা থেকে নদীতে পড়ে মারা যায়। গত দুই বছর আগে স্থানীয় লোকজন লাল মিয়াকে তার ভাসমান সংসার নিয়ে তীরে উঠে বসবাসের জন্য অনুরোধ করে। এরপর সন্তানহারা স্ত্রী খালেদাকে নিয়ে স্থানীয় বাবুল হাওলাদার তার বাড়ির পতিত ভিটায় লাল মিয়ার নৌকা ঘরটি বসিয়ে দেন। সেই থেকে শামিম (৯), শাওন (৭) আর শাহীন (৫) নামে তিন ছেলেকে নিয়ে নৌকা ঘরেই চলছে লাল মিয়ার সংসার। খেঁয়াঘাটে নৌকা চালিয়ে এবং স্ত্রী খালেদা বেতাগী শহরে বিভিন্ন হোটেলে পানি দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনোমতে চলছে লাল মিয়ার সংসার। লাল মিয়া বলেন, বেতাগীতে টয়লেটের তদারকির সময় প্রতিবন্ধী ভাতা পেতেন। এখন সে ভাতাও পাননা। বসতঘর তোলার মত নিজের কোনো জমি না থাকায় কোথাও স্থায়ী ঘর তোলা সম্ভব হচ্ছে না। বসতঘরের জন্য একটু জমি আর একটু ক্ষুদ্র ব্যবসার পূনর্বাসন পেলে হয়ত ভালভাবে বাঁচতে পারতাম ।এ ব্যাপারে আমূয়া বালিকা বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শামীম মোল্লা বলেন, লাল মিয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী ও ভূমিহীন। একটা খুপড়ি ঘর তোলার মত জমিও তার নেই। নৌকায় ঘর বানিয়ে পরিবারটি বসবাস করে। তাও আবার পরের জমিতে। সরকারি খাস জমি পেলেও একটা বসতঘর বানিয়ে থাকতে পারতেন। আমূয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আখতার হোসেন নিজাম মীরবহর জানান, প্রতিবন্ধি লাল মিয়া এ এলাকার বাসিন্ধা নয়। গত দুই বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন ও ভোটার তালিকায় নাম অন্তভূক্তির আবেদন করেছেন। বসবাস করার জন্য ভূমিহীন হিসেবে তাকে খাঁস জমি দেয়ার চেষ্টা করছি। আতিকুর রহমান/এফএ /এমএস