আন্তর্জাতিক

এক কিশোরের যুদ্ধবেলার গল্প

যুদ্ধ। যুদ্ধ মানেই মৃত্যুর গল্প, রক্তের গন্ধ, ধ্বংসের শব্দ। মৃত পুরুষ, মৃত নারী, মৃত শিশু, মৃত সৈনিক- এই হলো যুদ্ধের জটিল সমীকরণের সরল ফল; সে যুদ্ধ পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক। ইউক্রেন যুদ্ধে এক কিশোরের বেঁচে যাওয়ার একটি গল্প উঠে এসেছে আল-জাজিরার ‘দ্য স্টোরি অব ওয়ান ইউক্রেনিয়ান টিনেজার্স এসকেপ ফ্রম ওয়ার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। আইওয়ানা মলদোভানের প্রতিবেদনটি জাগো নিউজের পাঠকের জন্য বাংলায় অনু্বাদ করা হলো। অনুবাদ করেছেন নাঈম ফেরদৌস রিতম। ২০১৪ সালের বসন্তের কোনো এক রোববার। দিমিত্রির (ছদ্মনাম) মনে আছে সেদিন তার মা হারিয়ে গিয়েছিল। তারিখটা ঠিকঠিক মনে করতে না পারলেও দিমিত্রির এটুকু মনে আছে, দনবাসে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। দনেৎস্কের উত্তরে তার নিজের শহর হরলিভকাও যুদ্ধ থেকে মুক্ত নয়। খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় তার মাকে কিছু কিনতে বাড়ির বাইরে যেতে হয়েছিল। তিনি আর ফিরে আসেননি। দিমিত্রির বয়স তখন ১৬, হাইস্কুলে পড়ে। হরলিভকার উপকণ্ঠে লেকের পাশের একটি বাড়িতে মায়ের সঙ্গে থাকতো সে। খুব বেশি টাকা-পয়সা তাদের ছিল না, তবে চলে যাচ্ছিল ঠিকঠাকই। খাবার-কাপড়-কিছু টাকা-পয়সা বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার মোটামুটি সবই তাদের ছিল। কিন্তু এর সবই যুদ্ধ শুরুর আগের কথা। ইউরোমেইডান বিপ্লবের পর সবকিছু বদলে যায়। ইউরো আর ডলারের দাম বাড়তে থাকে, তাই তার মা যা আয় করছিল তা কম হয়ে যাচ্ছিল। সব কিছুর দাম বেড়েই যাচ্ছিল, বেড়েই যাচ্ছিল। এরমধ্যেই শুরু হয় যুদ্ধ। যা কিছু দরকার হচ্ছিল তার কিছুই পাওয়া যাচ্ছিল না। জীবন আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। ২০১৪-এর এপ্রিলে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হরলিভকায় পৌঁছে যায়। থানায় থানায় রাশিয়ার পতাকা টানিয়ে দিয়ে তারা যাদেরই একটু সচ্ছল মনে হচ্ছিল তাদের বাড়ি-গাড়ি জব্দ করতে শুরু করে। এ অবস্থায় সেখানে পৌঁছায় ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় হরলিভকায়। দিমিত্রি জানিয়েছে, তার মনে আছে মানুষগুলো সবসময় বলতো- কখন আর্মি আসবে? কখন আর্মি আসবে?প্রথমদিকে পরিস্থিতি খুব খারাপ মনে হচ্ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই বাড়িঘরে হামলা শুরু হয়ে গেল।‘আমি ঘরের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে চলতাম, চেয়ারের তলায় অথবা কোথাও লুকিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম কখন এর শেষ হবে। কোনো জায়গায় নিরাপদ ছিল না, না নিজের ঘরে, না বাইরে।’ একদিন দিমিত্রির বাড়িতেও হামলা চালানো হলো। সৌভাগ্যবশত সে সময় কেউ বাড়িতে ছিল না। ঘরের জানালা দিয়ে ওদের ঘরে ঢুকেছিল মিসাইল। বাড়ি ফিরে দিমিত্রি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওর মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। ওই দিন ওর মা বাইরে থেকে আর ফিরে আসেননি। পুরো বাড়িতে সে একাই ছিল। ‘মাকে আমি খুব ভালোবাসতাম। আমাকে ফেলে মা চলে যাবে, সে কথা আমি ভাবতেই পারি না। তার কিছু একটা অবশ্যই হয়েছে। আমার ভয় হয়, খুব খারাপ কিছু একটাই হয়েছে।’ মা নিখোঁজ হওয়ার দুদিন পর, গোলাগুলি একটু কমলে দিমিত্রি মাকে খুঁজতে বাইরে বের হয়। প্রথমে সে ভেবেছিল, মা হয়তো কোনো প্রতিবেশির বাড়িতে আছে। কিন্তু সে ছিল না। শহরের বাইরের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ফোনও করেছিল দিমিত্রি। কিন্তু তারা কেউ ফোন ধরেনি। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েক দিন ধরে দিমিত্রি তার মাকে হন্য হয়ে খুঁজে বেরিয়েছে। কিন্তু তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। গোলাগুলির তীব্রতা রাতে বেশি থাকায় ওই সময়টায় দিমিত্রি তার মায়ের খোঁজ বন্ধ রাখতো। ‘আমাদের বাড়ির বেজমেন্টে আমি একটা বছরেরও বেশি সময় সম্পূর্ণ একা ছিলাম। দেড় বছরের বেশি সময় আমি শুধু গমসেদ্ধ খেয়ে থেকেছি।’ তবে কখনো কখনো একটু রুটি বা স্যুপ দিয়ে দিমিত্রিকে সাহায্যও করেছেন তার প্রতিবেশিরা। যুদ্ধের একপর্যায়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও দিমিত্রিকে খাবার দিয়ে সাহায্য করেছেন। এছাড়া কিছু বন্ধুর কাছ থেকেও সাহায্য পেয়েছে দিমিত্রি। এই বন্ধুদের একজন তার প্রতিবেশি ছিল, যে দনেৎস্কের হয়ে যুদ্ধ করছিল। সে দিমিত্রিকে যুদ্ধে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছে বহুবার, বোঝানোর চেষ্টা করেছে তাদের আরো যোদ্ধা দরকরা। দিমিত্রিকে সে বলেছিল, আমাদের প্রচুর অস্ত্র আছে, কিন্তু নতুন লোক দরকার। তবে ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিমিত্রি। এরপর তার মোবাইল ফোনে একদিন একটা এসএমএস আসে, যাতে লেখা ছিল- আমাদের সঙ্গে যোগ না দিলে মরতে হবে। ওইদিনই হরলিভকা ছেড়ে পালায় দিমিত্রি। ‘দুটো প্যান্ট, একটা ভেস্ট, দুই জোড়া মোজা আর মোবাইল ফোনটা গুছিয়েই আমি দৌড় শুরু করি। যাওয়ার সময় এক প্রতিবেশির কাছ থেকে আমি ৩শ ইউরো নিয়ে যায়, ওরা আমাকে খাবার দিয়েও সাহায্য করতো। আশা করি, এই টাকা আমি একদিন শোধ করতে পারবো।’ এভাবেই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দিনটিকে স্মরণ করছিল দিমিত্রি। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চেকপয়েন্টটা হেঁটেই পার হয় দিমিত্রি। কোনো কার তাকে নিতে চাচ্ছিল না। তবে কোনোভাবে আটক না হয়ে টিকে থাকে সে। তারপর সে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে, বুকের উপর ভর দিয়ে মাঠগুলো পার হতে হয়েছে তাকে এই ভয়ে যে, ইউক্রেনের আর্মিরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাববে। ‘প্রথম রাতে আমি দুটো লাশের মাঝে শুয়ে ঘুমিয়েছি। পুরো মাঠটায় অসংখ্য লাশ পড়ে ছিল, মনে হচ্ছিল কোথাও থেকে লাশগুলো এনে পচানোর জন্য ফেলে রাখা হয়েছিল।’সময়টা ছিল আগস্ট। গরমটাও ছিল বেশি। আর বাতাসে ভাসছিল লাশের গন্ধ। ‘আমার মনে হয়েছিল, আমাকে যদি কেউ দেখতেও পায় তাহলে লাশ মনে করবে। ধরা পড়ার কথা মনে করেই আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম, দৌড়াতে হবে- এটা ছাড়া আমার মাথায় আর কিছুই আসছিল না।’ ৭০ কিলোমিটার হেঁটে ক্রাসনোয়ার্মস্কে পৌঁছায় দিমিত্রি। সেখানে পৌঁছানোর পর একজন তাকে গাড়িতে মধ্য ইউক্রেনের দনইপ্রোপেত্রোভস্কে পৌঁছে দেন। দিমিত্রির আশা ছিল সেখান থেকে তার দেশের বাইরে চলে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। দূর থেকে একটা ট্রাক আসতে দেখে রাস্তার মাঝখানে চলে গিয়ে ট্রাকটাকে থামায় সে। ট্রাকের চালক ভেবেছিল ছেলেটা হয়তো পাগল। ট্রাকটা অস্ট্রিয়া যাচ্ছিল শুনে দিমিত্রি চালককে কিছু টাকা দিতে চেয়ে বলে, তাকে পশ্চিম ইউরোপের সীমান্তের কাছাকাছি কোথাও পৌঁছে দিতে।  ‘আমি ইউক্রেনে থাকতেই ভয় পাচ্ছিলাম। আমার ভয় হচ্ছিল, ওরা আমাকে ধরে ফেলবে। আর কে জানে এরপর কী হবে আমার দেশে।’ ছেলেটা শেষ পর্যন্ত একটা ট্রাকের পেছনে থাকা বাক্সের ভেতর লুকিয়ে রোমানিয়া পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ভাগ্য তার সঙ্গে ছিল। ধরা পড়তেও পড়তেও একবারও সে সীমান্তরক্ষীদের চোখে পড়েনি। ১শ ইউরোর বিনিময়ে ওই ট্রাক চালক তাকে রোমানিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুসিয়েভা পর্যন্ত পৌঁছে দেন।  এরপর ট্রাক চালক তাকে জানিয়ে দেন, এর পরের রাস্তাটা দিমিত্রিকে নিজেই দেখে নিতে হবে। ছেলেটা আরো পশ্চিমের দিকে যেতে চেয়েছিল। তাই সে রাতে সুসিয়েভা থেকে একটি বাসে উঠে পড়ে। বাসটি যাচ্ছিল রোমানিয়ার পশ্চিমে ক্লাজে। ‘আমি ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙলো, বাসের লোকেরা আমাকে বলছিল, আমি বোধহয় খুব খারাপ কোনো স্বপ্ন দেখছিলাম। কারণ, আমি নাকি ঘুমের মধ্যে কাঁপছিলাম।’ ক্লাজে পৌঁছানোর পর দিমিত্রি তার যাত্রা চালিয়ে যায় হাঙ্গেরি সীমান্ত-লাগোয়া ওরাদিয়ার উদ্দেশে, তবে এবার ট্রেনে। আর হাঙ্গেরিতে ঢোকার সময় ওই শহরেই শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে দিমিত্রি। দিমিত্রির নানী ছিলেন রোমানিয়ান। ইউক্রেন যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল তখন দিমিত্রির নানাকে বিয়ে করে ইউক্রেনে চলে গিয়েছিলেন তিনি। হরলিভকায় জন্ম হলেও দিমিত্রির মা বাসাতে রোমানিয়ান ভাষা বলেই বড় হয়েছেন। দিমিত্রি নিজেও একইভাবে বড় হয়েছে। সীমান্ত পুলিশ যখন দিমিত্রিকে থামায় প্রথমে তারা ভেবেছিল সে হয়তো মলদোভার বাসিন্দা। কারণ, দিমিত্রি তাদের সঙ্গে রোমানিয়ান ভাষায় কথা বলছিল। এছাড়া পরিচয় দেয়ার মতো নাগরিকত্ব দেখনোর মতো কোনো কাগজপত্রও তার সঙ্গে ছিল না। সে পুলিশকে জানিয়েছিল, বাড়িতে কয়েকটা বিস্ফোরণে তার অনেক কাগজপত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। দিমিত্রি পুলিশকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, সে দনেৎস্ক থেকে এসেছে। একপর্যায়ে তাকে রোমানিয়ায় আশ্রয়প্রার্থীদের একটি কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কয়েকদিন পর তাকে রোমনিয়ার আরেক শহর তিমিসোয়ারার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ওই কেন্দ্রটি একটি বেসরকারি সংস্থা চালাচ্ছিল। দিমিত্রি রোমানিয়াতে থাকতে চায়। সে সেখানে কলেজে পড়তে চায় এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। ‘ইউক্রেনে ফিরে যাওয়ার জন্য আমার কিছু নেই। আমার মা নেই, আমার ঘর নেই। আমার বন্ধুদেরও বেশিরভাগ নেই: কেউ মারা গেছে, কেউ পালিয়েছে, কেউ আবার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হয়ে যুদ্ধ করছে।’ টলমলে চোখে কথাগুলো বলছিল দিমিত্রি। ‘আমি মাকে খুব মিস করি।’ মাকে খুঁজে পাওয়ার সব আশা হারিয়ে ফেলেছে দিমিত্রি।তারপরও মাকে খুঁজে যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সে। এখন যেহেতু সে নিরাপদে আছে, তাই আবার মায়ের খোঁজ শুরু করবে দিমিত্রি। শুরুতে সে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়, অথবা এমন যে কারো সঙ্গে যে তাকে সাহায্য করতে পারে। ‘লোকে বলে, অভিজ্ঞতায় মানুষ অনন্য হয়। বেশ, তাহলে আমি সবার চেয়ে আলাদা। কিন্তু এর জন্য আমাকে কতটা মূল্য দিতে হয়েছে?’ যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতির কথা মনে পড়ে কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলছিল দিমিত্রি। ‘মৃত পুরুষ, মৃত নারী, মৃত শিশু, মৃত সৈনিক। সব মৃত। আমার এই জীবনে আমি যা দেখলাম, আমি চাই না অন্য আর কেউ তা দেখুক।’বি.দ্র. এই কিশোরের নিরাপত্তার কারণে আল-জাজিরা তার আসল নাম ব্যবহার করেনি।   এনএফ/এবিএস