মতামত

বাংলাদেশে নগর পরিকল্পনা: প্রতিবন্ধকতা ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। দ্রুত নগরায়ণের ফলে নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা যেমন অগণিত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছি ঠিক তেমনি সেগুলো উত্তরণের মাধ্যমে সম্ভাবনার দ্বারও উম্মোচিত হচ্ছে। আমাদের শহরগুলো উন্নত হওয়ার সাথে সাথে অবকাঠামোগত ঘাটতি, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যাসমূহ ক্রমবর্ধমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রতিবন্ধকতা সমূহের মধ্যেই উদ্ভাবনী সমাধান এবং টেকসই নগর উন্নয়নের সম্ভাবনাও রয়েছে।

Advertisement

প্রধান প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমূহ: ১. দ্রুত নগরায়ণ: দ্রুত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে বাংলাদেশ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শহরগুলোর দিকে ধাবিত হচ্ছে। জনগণের এই শহর কেন্দ্রিক প্রবাহ বিদ্যমান অবকাঠামো এবং পরিষেবাসমূহের উপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে, যার ফলে শহরগুলোতে বসতি সমস্যা, যানবাহন সমস্যাসহ নানা সামাজিক ও মৌলিক চাহিদা গুলোর অপূর্ণতা থেকেই যাচ্ছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, জ্বালানি, বিদ্যুত, আবর্জনা অপসারণ ইত্যাদি ব্যাহত হচ্ছে। নগরায়ণ ও শিল্পায়ণের ফলে নগর জীবনের উচ্চ জীবন মান এবং বর্ধিত হারে গাড়ি ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ক্রমাগত পরিবেশ/বায়ু দূষিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ‘লিভারেজিং আরবানাইজেশন ইন সাউথ এশিয়া : ম্যানেজিং স্পেশাল ট্রান্সফরমেশন ফর প্রসপারিটি অ্যান্ড লিভেবিলিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করছে। নগরায়ণের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫১ সালে দেশের ৫৫ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করবে।

বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনা একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিন্তাশীল এবং উদ্ভাবনী সমাধানের দাবি রাখে। পরিকল্পিত নগরায়ণ মূলত একটি সামষ্টিক পদ্ধতি যা অবকাঠামোগত সমস্যা মোকাবেলা করা, পরিবেশগত স্থায়িত্বকে উৎসাহিত করা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে নিশ্চিত করাসহ নানবিধ কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত।

Advertisement

২.অবকাঠামোগত ঘাটতি: অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, গণপরিবহন, আবাসন, জ্বালানি এবং বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা আমাদের শহরগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা। প্রধান প্রধান শহরগুলোতে যানজট যেমন একটি সাধারণ সমস্যা অন্যদিকে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের চাহিদা বর্তমান সরবরাহের চেয়ে অনেক বেশি। যার ফলে উন্নত জীবনযাত্রার আশায় শহরগুলোতে পাড়ি জমানো মানুষজনও অপরিকল্পিত নগরায়ণের নগ্ন থাবায় আক্রান্ত।

৩. পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতা: অপরিকল্পিত নগরায়ণ নির্দ্বিধায় পরিবেশগত অবনতির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ প্রতিনিয়তই বায়ু দূষণ ,পানি দূষণ, বন উজাড় এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানবিধ হুমকির সম্মুখীন। কোনো স্থানের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য ন্যূনতম ২৫ ভাগ সবুজ প্রয়োজন অর্থাৎ যেকোনো শহরে অন্তত ২৫ ভাগ গাছপালা থাকা জরুরি। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে এই শতকরা হার প্রতিনিয়তই কমছে যার প্রভাব আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ভোগ করে যাচ্ছি। গাছপালা কমার ফলে উষ্ণ জলবায়ু, অসহনীয় তপমাত্রা আমাদের জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এই সকল সংকট মোকাবেলায় টেকসই নগর পরিকল্পনা অপরিহার্য।

৪.সামাজিক বৈষম্য: অপরিকল্পিত নগরায়ণ সামাজিক বৈষম্যকে আরও ত্বরান্বিত করে। চাহিদার তুলনায় ঢাকাসহ প্রধান শহরগুলোতে অপর্যাপ্ত বসবাসের স্থানের কারণে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ তুলনামূলক কম উন্নত কিংবা ঘিঞ্জি এলাকায় থাকছে যার ফলে একটি নীরব সামাজিক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে।

পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া। রাতারাতি এর আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও ধারাবাহিক নগর পরিকল্পনা শহরকেন্দ্রীক অনুন্নত জীবন ধারাকে পরিবর্তন করে উন্নত জীবন ধারায় রূপান্তর করতে পারে যার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ বহুবিধ উপকারিতা রয়েছে।

Advertisement

আধুনিক নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনাসমূহ মূলত নিম্নরূপ: ১. টেকসই উন্নয়ন: নগর পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন পরিবেশগত প্রভাব প্রশমিত করতে পারে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে পর্যাপ্ত সবুজ স্থানকে প্রাধান্য দিতে হবে। এছাড়া পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উন্নয়ন, পরিবেশ বান্ধব বিল্ডিং ডিজাইন বাস্তবায়ন টেকসই শহরের উন্নয়নে অবদান রাখে।

একটি টেকসই পরিকল্পিত শহর দেখতে কেমন, তা দেখার জন্য কোপেনহেগেন হলো একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই শহরের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়েছে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হিসেবে বাই সাইকেল ব্যবহারের একটি স্মার্ট মুভমেন্টের মাধ্যমে।

কোপেনহেগেনে, বাই সাইকেল চালানো এখন আর শখ বা অবসরকালীন বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই শহরের অর্ধেকেরও বেশি বাসিন্দাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাই সাইকেলের ব্যবহার কারণ তারা পরিবহনের প্রাথমিক মাধ্যম হিসাবে বাই সাইকেল ব্যবহার করে। শহরজুড়ে রয়েছে ডেডিকেটেড বাইক লেন, পার্কিং স্পট। শুধু এই টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার কারণে কোপেনহেগেনে যানজট ও কার্বণ নির্গমণের হার হ্রাস পেয়েছে এবং এই কারণেই কোপেনহেগেন বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরগুলির মধ্যে একটি।

কোপেনহেগেনের স্থানীয় সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং তারা এটি অর্জনের পথে রয়েছে।

বাংলাদেশেও এরকম স্মার্ট মুভমেন্টের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগরায়ণ করা সম্ভব।

২. স্মার্ট সিটি উদ্যোগ: প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্মার্ট সিটি ডিজাইনের উদ্যোগ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহনসহ সকল পরিষেবাসমূহে দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। শহর পরিকল্পনায় প্রযুক্তির ব্যবহার শহুরে বাসিন্দাদের জীবনের সামগ্রিক মান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি আমাদের মেট্রো রেল স্মার্ট সিটি উদ্যোগ কে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। মেট্রো রেলের ব্যবহার যেমন দৈনন্দিন জীবন যাত্রাকে গতিশীল করছে ঠিক তেমনই অর্থনৈতিক গতি প্রবাহ বৃদ্ধি করছে বহুগুণে। শুধু জীবন যাত্রার কিংবা অর্থনৈতিক গতি বৃদ্ধি নয়, মেট্রো রেল পরিবেশেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে কারণ অন্য সব গণপরিবহনের মত মেট্রো রেল কার্বন নিঃসরণ করে না। মেট্রো রেলের মত এমন আরো উল্লেখযোগ্য স্মার্ট উদ্যোগ কার্যকর পরিকল্পিত নগরায়ণকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

৩. সামাজিক সম্পৃক্ততা: পরিকল্পিত নগর পরিকল্পনায় সামাজিক সক্রিয় অংশগ্রহণ আধুনিক শহর গঠনে ভূমিকা রাখে। পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিতকল্পে সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

৪. অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য: শহরাঞ্চল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসাবে কাজ করে থাকে। বিভিন্ন শিল্পের প্রচার, ছোট ব্যবসাকে ত্বরান্বিত করা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ একটি স্থিতিস্থাপক এবং গতিশীল অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করে। এক্ষেত্রেও পরিকল্পিত নগরায়ণের ভূমিকা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ পদ্মা সেতুর কথা আলোচনায় আনা যেতে পারে। পদ্মা সেতু শুধু পরিবহন চলাচলের করিডোরই নয়, অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে শিল্পায়ণকে এগিয়ে নিতে এই সেতুর বিকল্প অপরিসীম। ফরিদপুর, মাদারীপুরসহ আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে এই পদ্মা সেতুর আশীর্বাদে নগরায়ণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তবে পরিকল্পিত নগরায়ণ না হলে, ঢাকার মত এই এলাকাসমূহ ও বিপর্যস্ত নগরীতে পরিণত হবে। এতে যেমন ব্যাহত হবে জীবনযাত্রা ঠিক তেমনই ব্যহত হবে অর্থনৈতিক বিপ্লব।

বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনা একটি জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিবন্ধকতাসমূহ চিন্তাশীল এবং উদ্ভাবনী সমাধানের দাবি রাখে। পরিকল্পিত নগরায়ণ মূলত একটি সামষ্টিক পদ্ধতি যা অবকাঠামোগত সমস্যা মোকাবেলা করা, পরিবেশগত স্থায়িত্বকে উৎসাহিত করা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে নিশ্চিত করাসহ নানবিধ কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত।

পরিকল্পিত নগরায়ণে প্রচুর ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে যেমন স্মার্ট প্রযুক্তি গ্রহণ থেকে শুরু করে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় সামাজিক সম্পৃক্ততা পর্যন্ত। এই প্রতিবন্ধকতাসমূহকে নেভিগেট করে এবং সম্ভাবনা গুলোকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের এমন শহর গড়ে তোলা সম্ভব যেগুলো শুধু অর্থনৈতিকভাবে প্রাণবন্তই নয়, টেকসই এবং সবার জন্য স্বস্তিদায়কও হবে ।

লেখক : পরিকল্পনাবিদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হতে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং পরিকল্পনা পরামর্শক কার্যক্রমসহ নির্মাণ ব্যবসার সাথে যুক্ত, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এর প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক।

এইচআর/এএসএম