এক.বিপন্ন মানবতার প্রলম্বিত ছায়াদেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বেদনার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসাসেই আয়নাল কুর্দির কথা কি সভ্যতা-মানবতা মনে রেখেছেযে বালিতে মুখ গুঁজে সমুদ্রতীরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল?
‘আমার সন্তানেরা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শিশু।ওরা প্রতিদিন আমার ঘুম ভাঙাতখেলা করত আমার সঙ্গেএর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কী হতে পারে?এ সবকিছুই হারিয়ে গেছে।’সিরীয় শিশু আয়নালের বাবা আবদুল্লাহ কুর্দিরশোকার্ত ওই উচ্চারণও কিকথিত মানবিক বিশ্ব মনে রেখেছে?
তুরস্কের সৈকতে লাল শার্ট, হাফ প্যান্ট পরানিথর আয়নাল কিছু বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিলঅভিবাসী-সংকট নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ইউরোপের নির্লিপ্ত নেতাদেরশেষ পর্যন্ত ঘুম ভাঙালেও এরই মধ্যেআয়নালের অনুজ গালিব আর তার মা রেহানাসহগৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়ার প্রায় আড়াই হাজার মানুষের প্রাণভূমধ্যসাগরে চিরতরে ডুবে গিয়েছিল!
তুর্কি আলোকচিত্র সাংবাদিক নিলুফার দেমি বলেছিলেন,‘যখন বুঝতে পারলাম ছেলেটাকে বাঁচানোর কোনো উপায়ই নেইমনে হলো ওর ছবি তুলি; বেদনাদায়ক ঘটনাটা দেখুক সবাইআশা করি, এ ছবি যে ধাক্কা দিয়েছেতা চলমান সংকট সমাধানে সহায়ক হবে।’
বালু দিয়ে আয়নালের ভাস্কর্য বানিয়ে এর মর্মস্পর্শিতারপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন ভারতীয় শিল্পী সুদর্শন পট্টনায়েক।ভাস্কর্যের পাশে তিনি লিখেছিলেন,‘ভেসে যাওয়া মানবতা... লজ্জা লজ্জা লজ্জা’।
আলোকচিত্র সাংবাদিক দেমি, ভাস্কর পট্টনায়েকতোমাদের সেই বেদনাকাতর আবেদনমেরুকরণের বিশ্বে ভূরাজনীতির সমীকরণের বৃত্ত ভেদ করে নাগাজায় চরম মানবিক বিপর্যয়েও পরাশক্তির ভোঁতা বিবেক জাগে নাইসরায়েলের জিঘাংসায় হাজার হাজার শিশু জন্মসনদের আগেইমৃত্যুসনদ নিয়ে ফের প্রশ্ন রেখেছে, এই কি সভ্যতার উৎকর্ষ আলো!
যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই- শান্তিপ্রিয়দের এ চিৎকার কে শোনেরাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও বিশ্বের কত দেশেইবিপন্ন-বিপর্যস্ত মানবতার ছায়া প্রলম্বিত ছায়া!
দুই.খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি
তোমরা টাকা জমাতে চাও? জমাও।আমি মানুষ জমাতে চাই, মানুষ।
তোমরা খ্যাতি কুড়াতে চাও? কুড়াও।আমি ফলবান বৃক্ষের মতো নত মানুষের পদস্পর্শ চাই।
তোমরা দীর্ঘায়ু হতে চাও? হও।আমি উৎকৃষ্ট শিল্পের জন্য বেদনাই চাই।
তোমরা সুখের কথা আড়ম্বর করে বলতে চাও? বলো।আমি দুঃখের চাষবাসই করে যেতে চাই।
তোমরা ক্ষমতার দণ্ডধারী হতে চাও? হও।আমি জীবনের উঠোনে জীবন বিলিয়ে প্রাণের উর্বরতা চাই।
তোমরা স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে চাও? ওঠো।আমি আত্মায় আত্মায় ডুবে যেতে চাই বলেই শিখিনি সাঁতার।
তোমরা কি জানো গাছের মগডালে কিংবা ক্ষমতার চূড়ায় উঠলেওনিচে কিন্তু নামতেই হবে কোনো এক বেলায়।
তিন.তুমি যেও না
যেও না, বারণ করছি; যেও নাস্থির জানি, গেলেই তুমি হারিয়ে যাবে।
তোমার নিয়তি হতে পারে না নিরুদ্দেশযাত্রাতুমি সাগরের ক্ষুব্ধ তরঙ্গে আছড়ে পড়া ঢেউতুমি মিছিলে মিছিলে বজ্রমুষ্টির স্মারকতোমাকে এভাবে প্রস্থান মানায় না, কখনও নাতুমি কালের যোগ্য উত্তরাধিকার।
লোডশেডিংয়ে অসহায় ল্যাম্পপোস্টের মাথা ছুঁইয়েঅন্ধকার তাড়িয়ে তুমিই দেখাও আলোআমাদের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানুকতাদের সরবরাহ বিদ্যুৎ না পেলেও আমরা আলোহীন নইবহুমাত্রিক বিশ্লেষণে ও বহুরৈখিক বিবেচনায়তোমাকে প্রয়োজন, খুব প্রয়োজন।
রাষ্ট্র-সমাজ শব্দ দুটি উচ্চারণমাত্র তুমি আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে ওঠোমনে পড়ে বিদ্রোহ-বিপ্লবের স্বপ্নধ্যানেতোমাকে স্তবের মতো উচ্চারণ করিযেও না, বারণ করছি; যেও নাস্থির জানি, তুমি গেলেই অঙ্গীকারগুলো হারিয়ে যাবে।
তুমি প্রাত্যহিক জীবনের খুব জরুরি অনুষঙ্গতুমি তাবৎ নির্মাণের রূপকার, অনিন্দ্যসুন্দরতুমি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের অববাহিকায় চরিত্রায়ণএত ক্লেদের মাঝেও তুমি দহনবেলার উচ্চারণতুমি হৃদয়ের গভীরে অন্তর্গত বোধ ও সৌন্দর্যতুমি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও নিঃসংশয়পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ণ, সূক্ষ্ম, তোমার প্রকাশ অনবদ্য।
যেও না, বারণ করছি; যেও নাতুমি চলে গেলে রূপগত পরিচর্যার পরিচয়মিশে যাবে ধুলোয়।
এইচআর/এমএস