খেলাধুলা

ঘরের উইকেট হোক নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী

বলা হচ্ছে মিরপুরের শেরে বাংলার পিচটাই যত সর্বনাশের মূল। সচেতন ক্রিকেট অনুরাগীদের মত, সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের পিচই ঠিক ছিল বাংলাদেশের জন্য। দেশের মাটিতে সিলেটের উইকেট হতে পারে টাইগারদের আদর্শ হোম কন্ডিশন।

সিলেট টেস্টের চালচিত্র দেখে যে কেউ তা-ই বলবেন। আসুন একটি ছোট্ট পরিসংখ্যান দেখে নেই, তাহলে পুরো দৃশ্যপট পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ঢাকায় শান্ত বাহিনী এক ইনিংসেও দুশো রানও করতে পারেনি। প্রথমবার ১৭২ আর পরের বার ১৪৪’এ শেষ হয়েছে ইনিংস। সেখানে সিলেটের পিচে বিপক্ষে উভয় ইনিংসে তিনশো’র বেশি (৩১০ ও ৩৩৮) রান করেছে বাংলাদেশ।

প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডেরও প্রথম ইনিসে স্কোর ছিল ৩০০’র ওপরে (৩১৭)। ওই টেস্টে গড়পড়তা স্কোর ছিল ২৮৬.৭৫; প্রায় ২৯০ রান। অথচ ঢাকা টেস্টের ইনিংসপিছু স্কোর ১৫৮.৭৫।

কিন্তু অবাক করা সত্য, বাংলাদেশ ম্যানেজমেন্ট সিলেটের চেয়ে শেরে বাংলার রহস্যঘেরা ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ পিচকেই নিজেদের সেরা হোম কন্ডিশন বলে ভাবলো। টেস্ট হারার পরও বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত প্রেস কনফারেন্সে বলে গেলেন, শেরে বাংলাই আমাদের বেস্ট হোম ভেন্যু!

সেটাই অনেক বড় ভুল। আসলে হোম কন্ডিশনের উইকেট হতে হবে নিজেদের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী। সে উপলব্ধিটাও খুব জরুরি। ঢাকা টেস্টের পর প্রশ্ন জাগে, টিম বাংলাদেশের কি সে উপলব্ধি আছে? আমাদের জন্য কোন কন্ডিশনটা সর্বোত্তম? হাথুরুর কি সে ধারণা আছে? মনে হয় না। তা থাকলে শেরে বাংলার এমন পাগলাটে পিচকে বেছে নিতেন না।

শেরে বাংলার পিচ টার্নিং। কখন কী হয় অনুমান করা ও বুঝে ওঠা খুব কঠিন। এমন পিচে কিউই বধের চিন্তার পাশাপাশি নিজেদের ব্যাটিং শক্তি-সামর্থ্য নিয়েও ভাবা উচিত ছিল। বল বেশি টার্ন করলে বাংলাদেশের ব্যাটারদের কী হবে? তামিম ইকবালের মত অভিজ্ঞ, দক্ষ ও পরিণত ওপেনার নেই। অনুকূল ও প্রতিকূল উভয় অবস্থায় শক্ত হাতে হাল ধরার মানসিকতা এবং পাল্টা আক্রমণা করার পর্যাপ্ত সামর্থ্যবান সাকিবও খেলছেন না।

লিটন দাসের ব্যাটও সুসময়ে বেশ ভালোই কথা বলে। তিনিও পারেন চড়াও হয়ে খেলতে। কিন্তু তারা কেউ নেই। মুশফিক আর মুমিনুল ছাড়া দলের বাকিরা সবাই তরুণ ব্যাটার। তারা প্রতিকূল অবস্থায় শক্ত হাতে হাল ধরার সামর্থ্য রাখে কিনা, বিরূপ পরিস্থিতিতে লড়াই করার পর্যাপ্ত সাহস আছে কিনা, তাও সম্ভবত খুঁটিয়ে দেখা হয়নি। আর সেই হিসেব-নিকেশ না করে একতরফা চিন্তার ফসল এই টেস্ট পরাজয়।

অথচ কিউইদের সাথে টেস্ট সিরিজ জিততে হাতে ছিল দুটি বিকল্প। এক, ঢাকা টেস্ট ড্র রেখে ১-০’তে সিরিজ জেতা। আর দুই, ম্যাচ জিতে কিউইদের ২-০’তে হারিয়ে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করা।

কিন্তু তার কোনোটাই হলো না। হবে কী করে? সিলেটে নিজেদের উপযোগী পিচে ১৫০ রানের বড় জয়েও সন্তুষ্ট না হয়ে আরও বেশি টার্নিং পিচকে নিজেদের নিরাপদ বাসস্থান বলে ভাবলো বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট। আর সেটাই ‘বুমেরাং’ হলো।

বাংলাদেশ হেড কোচ হাথুরুসিংহে হয়তো ভেবেছিলেন, সিলেটে পিচ তেমন অস্বাভাবিক আচরণ করেনি, তবু তাইজুল ১০ উইকেট পেয়েছেন। আর শেরে বাংলায় যখন বল পড়ে সাপের মত এঁকেবেঁকে আসবে, তখন কিউইরা তাইজুল-মিরাজের বলে ‘চোখে সর্ষে ফুল’ দেখবে।

কিন্তু তাদের যে একজন ফিলিপস আছেন, সেই ২৭ বছরের যুবা যে কাউন্টার অ্যাটাক করতে জানেন এবং প্রতিকূল উইকেটে অ্যাটাক করে সফল হওয়ার সাহস ও সামর্থ্য আছে, তা নিশ্চয়ই হাথুরু জানতেন না। আর তাই এমন পাগলাটে উইকেট বেছে নেওয়া। যার ফল হলো করুণ।

টাইগারদের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া নিউজিল্যান্ডের অলরাউন্ডার ফিলিপস। উইকেট অবশ্যই বড় ফ্যাক্টর। তারপরও এ টার্নিং পিচ জেতার সামর্থ্য ছিল বাংলাদেশের।

সাকিব ছাড়াও তাইজুল আর মিরাজরা টম ল্যাথাম, ডেভন কনওয়ে, কেন উইলিয়ামসন, হেনরি নিকলস আর ড্যারেল মিচেলকে ঠিকই বধ করেছেন। কিন্তু ফিলিপসকে পারেননি। আর তাই ঢাকা টেস্টে ফিলিপস ‘ম্যাজিকে’ শেষ হাসি কিউইদের। বোঝাই যায়, ফিলিপসকে নিয়ে কোনোই প্রস্তুতি ছিল না টিম বাংলাদেশের।

‘অ্যাটাক ইজ দ্যা বেস্ট ডিফেন্স’ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে কিউই স্পিনার অ্যাজাজ প্যাটেল আর মিচেল স্যান্টনারের ওপর পাল্টা আঘাত হানার কেউ থাকলে হয়তো দৃশ্যপট ভিন্ন হতে পারতো। তা ছিল না বাংলাদেশ দলে। আর তাই শেরে বাংলার পিচে বাংলাদেশের স্বপ্ন ভেঙে ম্যাচ ভাগ্য গড়লেন কিউই ব্যাটার গ্লেন ফিলিপস।

এআরবি/এমএমআর/জিকেএস