দেশজুড়ে

সমস্যায় জর্জরিত নওগাঁর আদিবাসী বিদ্যালয়টি

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার বড় মহেশপুর গ্রাম আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আদিবাসীদের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় বড়-মহেশপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ না হওয়ায় নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানে চারজন শিক্ষক বেতন বা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা দ্রুত বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের দাবি জানান। জানা গেছে, ১৯৯২ সালে ১২ শতাংশ জমির উপর চারটি মাটির ঘর নির্মাণ করে কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রাথমিকভাবে শিক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ১৯৯৫ সালে বড় বন্যায় বিদ্যায়টি সম্পন্ন ভেঙে যায়। এরপর ১৯৯৬ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা এবং বর্তমান স্থানীয় সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিমের সহযোগীতায় আবারো তৈরি করা হয় মাটির চার ঘর। ১৯৯৭ সালে অভিভাবকদের অনুরোধে বিদ্যালয়টিতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবেই চলতে থাকে শিক্ষা প্রসারের কাজ। ২০০৯ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ হীরালাল পাহান ও সুশীল চন্দ্র পাহান নিজের জমি বন্ধক এবং সুনীতি রাণী মন্ডল ব্যক্তিগত পারিবারিক অলঙ্কার বিক্রি করে বিদ্যালয়ের জন্য ৩৩ শতাংশ জমি কেনেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চারজন শিক্ষক কোনো সুযোগ সুবিধা না পেলেও শিক্ষার্থীদের পাঠ দান করে আসছেন। এর মধ্যে তিনটি কক্ষে পাঠদান ও একটি অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একটি বাথরুম আছে তাও বেহাল দশা। বর্তমানে এলাকার ১৫৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ছাত্র ৭৫ জন এবং ছাত্রী ৮৩ জন। বিদ্যালয়ে গত বছর ২৯ জন শিক্ষার্থী পিএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সবাই পাশ করে। কিন্তু গত বছর সারাদেশে বেসরকারি ২৬ হাজার বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট অফিসে দেয়া হলেও বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হয়নি।দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী অন্তরা পাহান, স্বপন পাহান, পঞ্চম শ্রেণির আফরিন বানু, রুবেল মুন্ডা, সোহেল মুন্ডা জানায়, বিদ্যালয়ের টিনছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই ছিদ্র দিয়ে পানি পড়ে বই ভিজে যায়। পঞ্চম শ্রেণির সিমা মুন্ডা, আশিষ মুন্ডা, সাথী মুন্ডা জানায়, বিদ্যুৎ না থাকা ও প্রয়োজনের তুলনায় ব্রেঞ্চ কম থাকায় চাপাচাপি করে বসতে হয়। এতে গরমের মধ্যে মাটির ছোট ছোট ঘরে বাতাস না আসায় তাদের পড়াশুনা ব্যাপক গরম লাগে। শিক্ষার্থীর অভিভাবক লক্ষণ পাহান ও মঙ্গা মুন্ডা জানান, আমরা গরীব মানুষ হওয়ায় মানুষের বাড়ি কাজ করে সংসারের খরচ জোগাতে হয়। যে টাকা পান সেই টাকা দিয়ে সংসারের খরচের বাহিরে শিশুদের গ্রামের বাহিরে রেখে পড়াশুনা করানো সম্ভব নয়। বিদ্যালয়টি সরকারি হলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো।বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুনীতি রাণী মন্ডল জানান, প্রতিদিন প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে বিদ্যালয়ে আসেন। এভাবে দশটি বছর কেটে গেছে। বিদ্যালয় সরকারিকরণ না হওয়ায় কোনো বেতন পান না। বিদ্যালয় থেকে কোনো অর্থ না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে কষ্টে জীবনযাপন করতে হয়। শিক্ষক কিরণ পাহাণ জানান, মাটির তৈরি বিদ্যালয়টি টিনের ছাউনি পুরনো হয়ে মাঝে মাঝে ফুটো হয়েছে। ঝড়বৃষ্টিতে শ্রেণি কক্ষে পানি পড়ে। জানালাও ভেঙে গেছে। বিদ্যালয়ে বেঞ্চ কম থাকায় শিক্ষার্থীদের চটে বসে পাঠদান করতে হয়। এছাড়া গরমের সময়ও শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কক্ষে পড়াশুনা করতে প্রচন্ড কষ্ট হয়।শিক্ষক সুশিল চন্দ্র পাহান জানান, এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার আগে এই আদিবাসী পাড়া অন্ধকার ছিল। শিক্ষার কোনো আলো তাদের মধ্যে ছিল না। তাদের শিক্ষিত করতেই এই বিদ্যালয়টি গড়ে তোলা হয়েছে।প্রধান শিক্ষক হীরালাল পাহান জানান, সরকারিভাবে ২০১২ সালে সকল বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট অফিসে আবেদন করা হয়। পরের বছরও বিদ্যালয়ের কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট অফিসে দেয়া হয়। কিন্তু কি কারণে তাদের বিদ্যালয় সরকারি করা হয়নি তা জানা নেই।  তিনি আরো জানান, বাংলা ভাষার পাশাপাশি আদিবাসী ভাষাও শিক্ষা দেয়া হয়। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যে স্বপ্নের বিদ্যালয় তারা গড়তে চলেছেন। বিদ্যালয়ের ছাউনির জন্য টিন কেনার অর্থও নেই। অর্থের অভাবে থেমে আছে নতুন ভবনের কাজ। নতুন ভবনের ছাউনির জন্য এখনো প্রায় ২০ ব্যান্ডেল টিনের প্রয়োজন। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। এরা অধিকাংশ ভূমিহীন ও গরীব হওয়ায় সবার পক্ষে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। অর্থের অভাবে অনেকেই ঝড়ে পড়ে।চেরাগপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এশরাক হোসেন জানান, আদিবাসী স্কুলে যে শিক্ষকগুলো আছে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ না হওয়া মানবেতর জীবনযাপন করেন। আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করে। বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হলে ছেলেমেয়েরা অনেক উপকৃত হতো। বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের দাবি জানান তিনি।মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম তাজকির-উজ-জামান জানান, আদিবাসী বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা যদি বিদ্যালয়ের কাগজপত্র নিয়ে আসে তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তা পাঠানো হবে। সেখানে যে নতুন ভবন হয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে দুই বান্ডেল ঢেউটিন প্রদান করা হবে। ওই প্রতিষ্ঠানে যে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করে সবাইকে শিক্ষাবৃত্তির মধ্যে নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি আগামী মাসের মাঝামাঝিতে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করতে পারবো।এআরএ/এমএস