ভ্রমণ

কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে ষাট মিনিট!

লোকটার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চির বেশি হবে না। শরীরের গঠন দেখে বাংলা সিনেমার জাম্বুর কথা মনে পড়ে। চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই মালয়েশিয়ান নাকি ইন্ডিয়ান। গায়ের রঙ বলে ইন্ডিয়ান তামিল, আবার চেহারা মালয়েশিয়ান। পেছনে হাত দিয়ে গম্ভীর হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ট্যুরিস্ট?’ আমি মাথা ঝাঁকাতেই আঙুল দিয়ে লাইন দেখিয়ে বলল, ‘দ্যাট লাইন।’ ডান দিকের লাইনে তখন ৩০ জনের বেশি দাঁড়িয়ে। আমিও দাঁড়ালাম। প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া। কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে বিমান অবতরণ করেছে। বিমান থেকে নেমে ছোট্ট করিডোর ধরে মেইন বিল্ডিংয়ের টার্মিনালে ঢুকতেই দেখি ৪-৫ জন চেচাচ্ছেন। ‘ট্রানজিট, ট্রানজিট। স্টুডেন্ট, স্টুডেন্ট। ট্যুরিস্ট, ট্যুরিস্ট।’ একটু ভড়কেই গেলাম। বোঝার চেষ্টা করছি- কী হচ্ছে? এটাতো ইমিগ্রেশন কাউন্টার না। এখানে এরা এভাবে চেচাচ্ছে কেন? এর মধ্যে তামিল জাম্বু আমাকে ডানের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিল। লাইনে দাঁড়িয়ে যা বুঝলাম, তাহলো একদম বামে ট্রানজিট যাত্রীদের লাইন, ৩০-৩৫ জনের মতো হবে। মাঝে স্টুডেন্টদের লাইন, ১০-১২ জনের মতো। আর ডান দিকের লাইনে আমরা। ১৮০ যাত্রীর বিমানের বাকি সবাই ট্যুরিস্ট ভিসার যাত্রী। আর তাই লম্বা হতে থাকল আমাদের লাইন। এমন সময় আমিনুল ভাই কাঁদো কাঁদো চেহারা নিয়ে এসে বলল, ‘ভাই আমার পাসপোর্টটা ফেরত দিতে বলেন। ঐ লোকটা নিয়া গেছে।’ আঙুল দিয়ে লিকলিকে শরীরের একজনকে দেখালো। হাতে অনেকগুলো পাসপোর্ট। একেকজনের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিচ্ছে আর কুৎসিত করে হাসছে- যেন অবৈধ যা খুঁজছিল, তা-ই তার হাতে! ১৫-২০ টার মতো সবুজ রঙা পাসপোর্ট তার হাতে।‘কেন নিয়েছে কিছু বলেছে?’ জিজ্ঞাসা করতেই আমিনুল ভাই বললেন, ‘না ভাই, কোনো কথা না বলেই নিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি যাতে বের হয়ে যেতে পারি তাই লাইনের সামনের দিকে দাঁড়ায়াছিলাম। হাত থেকে টান দিয়া পাসপোর্ট নিয়া গেছে।’ আমিনুল ভাইয়ের কথা শুনে আমার পেছনে দাঁড়ানো আরেকজন নিজে থেকেই বলল, ‘টেনশন নিয়েন না, ফেরত দিয়া দিবে। চেক করতেছে, আপনারে ঢুকতে দিবো কিনা। কারো পাসপোর্ট আটকাইয়া রাখব না।’ তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এরা কারা? আমাদের এখানে আটকে রাখছে কেন? আমিতো কোন ইমিগ্রেশন ডেস্ক দেখছি না।’ - হ ভাই, আমাগো দেশি পাসপোর্ট দেখলেই এমন শুরু কইরা দেয়। কম বেশি সব সময় করে। তবে আজকে একটু বেশি করব মনে হইতেছে। এরা ইমিগ্রেশনেরি লোক। ওইযে মটুরে দেখতেছেন, এ হইল গ্রুপের লিডার। আর মেইন ইমিগ্রেশন কাউন্টারগুলা চাইরটা ফ্লোর নিচে। সেইখানে তেমন ঝামেলা করে না। - আপনারা কিছু বলেন না? কেউ প্রতিবাদ করে না?- কে করব ভাই? কে চায় আজাইরা ঝামেলা নিজের কান্ধে নিতে। আপনেও করবেন না।এসেছি প্রথমবারের মতো। এখন শুনছি অনেক ট্যুরিস্টকেও ফেরত পাঠিয়ে দেয়। ভেবে দেখলাম কথাতো ঠিক। আমি সাহসী কেউ না, আমি কেন যেচে ঝামেলা নিব। জিজ্ঞেস করলাম- ‘আমাকে কি ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারবে?’ - আপনারে বোধহয় দিবে না। তবে ইমিগ্রেশন আইন এমন যে চাইলেই ওরা দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে। ওগো সবাইরে দোষ দিয়াও লাভ নাই। আমাগো কি দোষ নাই। ওই যে দেখেন, উনার ড্রেস-আপ, গেট-আপ দেইখা কি মনে হয় ট্যুরিস্ট? আইছে কাজ করতে। কিন্তু নিয়া আইছে ট্যুরিস্ট ভিসা। একবার ঢুকতে পারলে আর ব্যাক করবো না। এদের জন্য সবাইরেই ঝামেলা পোহাইতে হয়। তবে ফ্যামিলি নিয়া আসলে প্রবলেম করে না, লগে লগে ছাইড়া দেয়। ওইযে দেখেন, দুইটা ফ্যামিলি চলে যাইতেছে। কথা শেষ না হতেই আমিনুল ভাইয়ের দিকে তাকালাম। ওনার সাথে বিমানেই পরিচয়। দিনাজপুর বাড়ি। তার ভাই অনেকদিন ধরে থাকেন মালয়েশিয়া। দেশে কিছু করতে পারছেন না, তাই ছুটছেন মালয়েশিয়া। ভাগ্য পরিবর্তনে। ট্যুরিস্ট ভিসায় এসেছেন। ঢুকতে পারলে ফেরত যাবেন না। অবৈধ হয়েই থেকে যাবেন। লাইনে দাঁড়ানো অনেককেই দেখে এরকম মনে হল। সময় গড়াচ্ছে। আমাদের সারি লম্বা হচ্ছে। ট্রানজিট, স্টুডেন্ট ভিসার যাত্রীরা এরি মধ্যে চলে গেছেন। শুধু আছি আমরা।হাকাহাকি ডাকাডাকিও কমে গেছে। তামিল জাম্বু আগের মতোই গম্ভীর হয়ে সবাইকে যাচাই করছে। পেছনে হাত দিয়ে সবার চেহারার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে যেন সবাই ড্রাগ স্মাগলার। এক পা এগুচ্ছে আর যাকে পছন্দ হচ্ছে তাকে বলছে, ‘হেই ইউ, গো দেয়ার।’ দ্বিতীয় আরেকটা লাইন করে সেখানে পাঠাচ্ছে। আমার সামনে এসে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘ইউ।’ তারপর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘দেয়ার।’ আমি লাইন বদলে দ্বিতীয় লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দ্বিতীয় লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা হাফ ছাড়লাম। বোধহয় এ লাইনের মানুষগুলোকে তেমন ঝামেলা করবে না। হঠাৎ হাসির শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি, সেই লিকলিকে কুৎসিত হাসির লোকটা আরো কুৎসিত করে হাসছে। তার সামনে একটা ট্রলি। ট্রলির নিচের অংশে অনেকগুলো পাসপোর্ট, উপরের অংশে বাকিগুলো। একটা পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে সেই কুৎসিত হাসি দাঁত ফুড়ে বের হয়ে আসছিল। তামিল জাম্বু গিয়ে কি যেন বলল। তারপর দু’জন হাসতে লাগল। যার পাসপোর্ট নিয়ে হাসাহাসি করছে সে বেকুবের মতো তাকিয়ে আছে। জাম্বু গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাবেন, কেন এসেছেন?’ লোকটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। কিছু বলছে না। সেই লিকলিকে কুৎসিত হাসির লোকটা তখন বাংলাদেশি লোকটাকে ঘুরিয়ে পেছনে পা তুলে লাথি মারার মতো করে বলছে, ‘গো ব্যাক, গো ব্যাক’। যাকে বলছে সে তখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আর সেই লিকলিকে লাথি মারার মতো করে পা তুলে বলেই চলেছে, ‘গো ব্যাক, গো ব্যাক।’ একবার লাথি মেরেই ফেলল? মনে হচ্ছিল গিয়ে একটা ঘুষি মেরে বসি। আমি আশপাশের সবার দিকে আবার তাকালাম। নাহ, কেউ কিছু বলছে না। শুধু একজন নিচু স্বরে বলল, শুধু সবুজ পাসপোর্ট বলেই আমাদের সাথে এমন আচরণ। এদিকে দ্বিতীয় লাইনে তামিল জাম্বু চলে এলো। এমন ভাবে তাকাচ্ছিল যেন স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দ্বিতীয় লাইন থেকে কাউকে কাউকে তৃতীয় একটা লাইন বানিয়ে সেখানে পাঠিয়ে দিচ্ছিল। আমার কাছাকাছি আসতেই তাকিয়ে বলল, ‘পাসপোর্ট?’ প্রশ্ন করার সাথে সাথেই দিয়ে দিলাম। পাসপোর্টের পাতা উল্টে কি যেন দেখল। পেছনের অ্যাসিস্ট্যান্টকে সেটা দিয়ে আমাকে বলল, ‘গো টু দ্যাট লাইন।’ তৃতীয় লাইনে পাঠিয়ে দিল আমাকে। আমি মিশ্র অনুভূতি নিয়ে লাইন পাল্টালাম। মনে হলো, তৃতীয় লাইনের যাত্রীরা সহজেই পাড় পেয়ে যাবেন।কিন্তু না।  কোথায় যাবেন? কোথায় থাকবেন? কতদিন থাকবেন? কত টাকা নিয়ে এসেছেন? হোটেল বুকিং কই? রিটার্ন টিকিট কই? কারুর মানিব্যাগ চেক করছে, কারো ব্যাগ। মানিব্যাগে টাকা ভাজ করা নাই কেনো? নতুন জুতো পরে এসেছেন কেন? হাজারো প্রশ্নে জর্জরিত করছে। মাঝে মাঝে মালয়েশিয়ান ভাষায় কথা বলছে। উচ্চারণ ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, গালি জাতীয় কিছু হবে। আর এই ভয়াবহ বিড়ম্বনায় পরে বাংলাদেশি মানুষগুলো সহ্য করে যাচ্ছে। ৫০ মিনিট হয়ে গেছে দাঁড়িয়ে আছি। প্রশ্নবান কখন ছুড়বে, অপেক্ষায় আছি। এ থেকে কখন ছাড়া পাবো বুঝতে পারছি না।  তিন লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর টেনশন বাড়ছে। প্রথম লাইনের একজনকে পাসপোর্ট দেখিয়ে বলছে, ‘এটা টেম্পার্ড পাসপোর্ট। তুমি আরেকজনের পাসপোর্টে নিজের ছবি লাগিয়ে চলে এসেছো।’ বাংলাদেশি বলছে, ‘এটা আমার পাসপোর্ট। এই দেখো আমার নাম শাহরিয়ার। এই পাসপোর্ট  নকল না, আসল।’ - নাহ, এটা গলাকাটা। এ রকম করেছে বলে তোমার ভাইকে গত মাসে অ্যারেস্ট করেছি। - আমার কোনো ভাই নাই, সে মালয়েশিয়ায় আসবে কোথা থেকে।  - না না, ওইটা তোমার ভাই ছিল। একদম এক চেহারা। - আমার ভাই থাকলে তো আসবে। শাহরিয়ার ভাইয়ের উত্তেজিত চেহারা দেখে হো হো করে হাসছিল ইমিগ্রেশনের লোকগুলো। বিদ্ঘুটে ঐ হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ইচ্ছে করেই ওরা এমন করছে। আমরা যেন ওদের কমেডি সার্কাসের হাসির পাত্র। হাসতে হাসতে প্রথম লাইন থেকে তৃতীয় লাইনে আমার কাছে চলে এল জাম্বু। এসেই গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়ার উইল ইউ গো টু মালয়েশিয়া?’ আমি শুধু বললাম, ‘কুয়ালালামপুর।’ কথা শেষ না হতেই পেছনে ঘুরে অন্য আরেকজনের দিকে তাকিয়ে মালয়েশিয়ান ভাষায় কি বলা শুরু করল। লিকলিকেটা আমার পাসপোর্টটা নিয়ে আমার কাছে চলে আসল। বলল, ‘ইউ গো।’ আমি কিছুটা ভড়কে গিয়ে বললাম, ‘হোয়ার?’ - টু দ্য ইমিগ্রেশন।আমি এদিক-সেদিক তাকালাম। লম্বা টার্মিনাল ছাড়া কিছু নেই। একজন বলল, ‘আপনি ভাই লাকি, এক প্রশ্নে ছাড়া পেলেন, তাড়াতাড়ি ভাগেন। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেই কিন্তু  আটকে দিবে।’হাতে পাসপোর্ট আর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আমি ধীরে ধীরে টারমিনাল ধরে এগুলাম। পেছনে ফিরে তাকিয়ে তিন লাইনে দাঁড়ানো যাত্রীদের দেখে ভাবছিলাম, এত ঝকঝকে তকতকে আধুনিক এয়ারপোর্টে এত দুর্ব্যবহার, দুর্ভোগ, লাঞ্ছনার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা দেশি মানুষগুলোর মধ্যে আমি কি কিছুটা ভাগ্যবান?প্রথমবারের সেই ভ্রমণে যতদিন মালয়েশিয়া ছিলাম, যত জায়গা ঘুরে বেড়ালাম, যত মানুষের সাথে দেখা হলো, সবসময় সেই ‘৬০ মিনিট’ আমাকে তাড়া করে বেরিয়েছে।এসইউ/এবিএস