সাম্প্রতিক পার্বত্য খাগড়াছড়ির সদর উপজেলা ও মাটিরাঙা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে এখনো শুরু হয়নি কোনো ত্রাণ বিতরণ। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনও খোলা আকাশের নিচেই দিন কাটাচ্ছেন। এদিকে গড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের ত্রাণ শাখায় বিপুল পরিমাণ খাদ্যশষ্য ও অর্থ পড়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তাকিয়ে আছে মন্ত্রণালয়ের দিকে। আবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের অসহযোগীতায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনও তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেনা।খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ে সদর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে ৭শ ৯৮টি পরিবার এবং মাটিরাঙা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ২শ ৫২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় তৃণমূল জনপ্রতিনিধিরা যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রেরণ না করায় জেলা প্রশাসনও ত্রাণ বিতরণ করতে পারছেন না।সরেজমিনে সদর উপজেলার রাঙাপানি ছড়া, আলাধন পাড়া, তৈবালাই, সাতভাইয়া পাড়া, বগড়াছড়া, কুমিল্লাটিলা, কমলছড়ি, ঠাকুরড়া, আগবাড়ীসহ মাটিরাঙা উপজেলার বিভন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ মাটির ঘরের ছাউনি উড়ে গেছে। বেড়ার ঘরগুলো উপড়ে গেছে ঘূর্ণিঝড়ে। পাশাপাশি কলা-আম-লিচুর বাগান এবং ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের তিনদিন পরে জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠ পরিদর্শনে নামলেও এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাননি।খাগড়াছড়ি সদর উপজেলাধীন সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত গোলাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়া ও গ্রামের কমপক্ষে ১শ ৮০টি পরিবার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু জেলা পরিষদ কিংবা জেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় অধিকাংশ পরিবার এখনও খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সব কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও ঘূর্ণিঝড়ের এক সপ্তাহ পরও অনেক পরিবারকে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে।রাঙাপানি ছড়ার বয়োবৃদ্ধ চিত্তরঞ্জন চাকমা জানান, এরকম একটি দুর্যোগের পরও জেলা পরিষদ কিংবা প্রশাসনের এমন নির্লিপ্ততা তাদের হতবাক করেছে। বগড়াছড়া নতুনপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা জানান, বেশিরভাগ পরিবার দিনমজুর এবং জুমিয়া। ঘরবাড়ি এবং ফল-ফসল হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আশেকুর রহমান জানান, ঘটনার পর পরই সংসদ সদস্য মহোদয় ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনের অজুহাতে সময়মতো তালিকা না দেয়ায় ত্রাণ বিতরণের কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।এদিকে মাটিরাঙা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম মশিউর রহমান মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, মাটিরাঙা উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত ২শ ৫২টি পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহসাই তাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এদিকে পার্বত্য জেলা পরিষদের ত্রাণ শাখায় বিপুল পরিমাণ খাদ্যশষ্য এবং অর্থ থাকার পরও ক্ষতিগ্রস্তদেরকে আপদকালীন সাহায্য না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. নাসির উদ্দিন আহমেদ।জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান জানান, পরিস্থিতি সামাল দেয়ার প্রস্তুতি প্রশাসনের রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা যথাসময়ে সাড়া না দিলেও ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার পক্ষ থেকে সরেজমিনে এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এবং দু’একদিনের মধ্যেই ত্রাণ বিতরণ শুরু হবে।খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানান, শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যেতে পারেননি। তবে সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের টেলিফোনে সার্বক্ষণিক তদারকির মধ্যে রেখেছেন। এফএ/পিআর