বাঁশখালীর গন্ডামারা গ্রামে ৪ জন নিহত হওয়ার ৪ দিন পরও শোকের আবহ কাটেনি। পুরো গ্রাম জুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বৃহস্পতিবার নিহতদের স্বরণে চারদিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিন (কুলখানি) সম্পন্ন করেছেন স্বজনরা। এ উপলক্ষে সকাল থেকে স্বজনদের ভিড় লাগে নিহতদের বাড়িতে। পরিবারের সদস্যদের কান্না যেন এক মুহূর্তের জন্যও থামছে না। এদিকে থমথমে এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার গন্ডামারা গ্রামে পরিদর্শনে যান। তারা সেখানে আহত এবং নিহতদের স্বজনদের সাথে কথা বলেন। স্বান্তনা জানান। নতুন করে যেন কোন ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে কেউ সুযোগ নিতে না পারেন তার জন্য আওয়ামী লীগ নেতারা স্থানীয়দের পরামর্শ দেন।চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সাতকানিয়া সার্কেলের এএসপি একেএম এমরান ভুইয়া জানিয়েছেন, বাশঁখালীর পরিস্থিতি এখন শান্তিপূর্ণ, যে কোন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি এড়াতে আইন শৃংখলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।গন্ডামারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ‘ভিটামাটি রক্ষা কমিটি’র আহ্বায়ক লিয়াকত আলী বলেন, আপাতত শোক কাটিয়ে উঠা পর্যন্ত কোন কর্মসূচি নেই। এতো বড় একটা ঘটনা ঘটেছে। এলাকাবাসীর মনে এক দিকে শোক অপর দিকে তারা ক্ষুব্ধ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে বাঁশখালীবাসী দেশের জন্য ক্ষতিকর এ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখানে হতে দেবে না। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে কি পরিমাণ ক্ষতি হবে তার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন এক হাজার মেট্রিক টন কয়লা যদি জ্বলে, এখানে পরিবেশের অবস্থা কী হতে পারে, আপনারা শিক্ষিত মানুষ আমার চেয়ে ভালো জানবেন। এক হাজার মেট্রিক টন কয়লার ফ্লাই অ্যাশ আকাশে উড়বে, সূর্য অন্ধকার হয়ে যাবে। যে ধোঁয়া উঠবে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের কারণে মেঘ হবে না। যদি ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মেঘও না হয়, সূর্যও দেখা না যায়, তাহলে মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে এখানকার পরিবেশ। প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে।কমিটির সদস্য আবু আহমেদ জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে ১০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রম্ত হবে। তিনি বলেন, ‘কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে এই যে আমাদের বঙ্গোপসাগর আছে ওখানে প্রচুর মাছ হয়। আমাদের জেলেরা মাছ ধরে। পশ্চিমে আমাদের কতগুলো লবণের মাঠ আছে। ওখান থেকে মানুষ লবণ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ এলাকায় দেড়শো পরিবার আছে। আসলে এখানে ১০ হাজারের মতো পরিবার আছে। এসব মানুষকে ক্ষতির মুখে ফেলে এরা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র করছে। রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে পরিবেশবিজ্ঞানীরা যাচ্ছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের এখানে কোনো পরিবেশবিদ আসছেন না। হয়তো এস আলমের (প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে বোঝাপড়া হয়ে গেছে। আমরা সরকারকে বলতে চাই আমরা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না।তবে গ্রামবাসীর এসব বক্তব্য মানতে রাজি নন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের কর্তারা। এসএস পাওয়ার লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান বাহাদুর আলম হিরন দাবি করেন, এ প্রকল্পের কারণে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না।বাহাদুর আলম বলেন, প্রজেক্টরের মাধ্যমে মানুষকে দেখানো হয়েছে। পরিবেশের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না। একটা সিগারেট খেলে যে পরিমাণ ধোঁয়া বের হয়, সে পরিমাণ ধোঁয়াও সেখানে বের হবে না বলে দাবি করেন তিনি।বাহাদুর আলম আরো বলেন, ‘গত ২৭ তারিখে আমাদের এমপি মহোদয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ওই এলাকায় বলেছিলেন যে আপনাদের ১০ জনকে নিয়ে যাওয়া হবে বিদেশে। সেখানে আপনারা প্রাকটিক্যালি দেখে আসবেন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র উপকার করে না অপকার করে।’গতকিছু দিন ধরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে মিছিল, সমাবেশ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটছিল। জীববৈচিত্র ধ্বংস, লবণ ও চিংড়ি চাষে জড়িতরা বেকার হওয়া, পরিবেশ বিপর্যয় ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারাবে এমন আশঙ্কা থেকে স্থানীয় একটি পক্ষ শুরু থেকে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যে সীমানা পিলার স্থাপন ও জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছিল।অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে দেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হচ্ছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গন্ডামারা পশ্চিম বড়ঘোনায়। চায়না সেবকো এইচটিজির সঙ্গে যৌথভাবে ৬০০ একর জমির ওপর ২০ হাজার কোটি টাকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে এস আলম গ্রুপ। কয়লাভিত্তিক ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৭০ শতাংশের মালিকানা চট্টগ্রামের শিল্প পতিষ্ঠান ও বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টিভি’র মালিক এস আলম গ্রুপ, ৩০ শতাংশের মালিকানা থাকবে দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানের।এআরএস/এমএস