বিশেষ প্রতিবেদন

বরগুনার ইলিশ ঢাকায় পৌঁছালেই দ্বিগুণ দাম

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ আসতে আর কয়েকটা দিন বাকি। বাংলা নতুন বছর শুরুর এই দিনে পান্তা-ইলিশ খাওয়া পরিণত হয়েছে বাঙালির চিরচারিত নিয়মে। বছরের অন্যান্য দিনগুলো বাদ গেলেও অন্তত এই দিন সকলে চায় তাদের আয়োজনে স্থান পাবে পান্তা-ইলিশ। তাই এ দিনকে কেন্দ্র করে রূপালি ইলিশের কদর দেশের সব যায়গায় একটু বেশি। বিশেষ করে ঢাকা শহরে উচ্চবিত্ত ও নব্য ধনীদের বসবাস বেশি হওয়ার কারণে এখানে নববর্ষে ইলিশের চাহিদাও আকাশচুম্বী। সামুদ্রিক ইলিশ লবণাক্ত হওয়ায় বরিশাল অঞ্চলের মিঠা পানির ইলিশের কদর একটু বেশি। আর এ কারণেই বরিশালের ইলিশের বাজার সব সময় চড়া। রাজধানীতে ইলিশের ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অধিক মুনফা লাভের আশায় বরগুনা থেকে ইলিশ কিনে তা ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করছেন দ্বিগুণ দামে। দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নববর্ষে স্থানীয় বাজারের চেয়ে রাজধানী ঢাকায় ইলিশের চাহিদা বেশি। তাই বরগুনার আড়তদাররা জেলেদের কাছ থোকে ইলিশ কিনে তা প্যাকেট করে সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ঢাকার মোকামে। পরে সেই ইলিশ ঢাকার বাজারে বিক্রেতারা দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছেন। ইলিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলা নববর্ষের কারণে অন্য স্থানের চেয়ে ঢাকায় ইলিশের চাহিদা বেশি। আর স্থানীয় বাজারের তুলনায় ঢাকায় দামও পাওয়া যায় অনেক বেশি। তাই তারা প্যাকেট করা এসব ইলিশ ঢাকা পাঠাচ্ছেন।বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) পাথরঘাটা সূত্রে জানা গেছে, পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এক কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার থেকে ৩২’শ টাকা করে। আর মণ বিক্রি হচ্ছে এক লাখ ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা করে এবং ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের মণ বিক্রি হচ্ছে ৮৫ হাজার টাকা থেকে ৯০ হাজার টাকা করে।জানা গেছে, বরগুনা থেকে পাইকাররা যখন এই ইলিশ ঢাকার মোকামে নিয়ে আসেন, তখন এই ইলিশের দাম আরেক ধাপ বেড়ে যায়। তখন তারা এক লাখ ২০ হাজার টাকার ইলিশ ঢাকার আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকায়। আর এই ইলিশ ঢাকার আড়তদারদের হাতে যাওয়ার পর দাম বেড়ে যায় আরেক দফা। আর সর্বশেষ ধাপে খুচরা বিক্রেতারাও অবস্থা বুঝে দাম চড়িয়ে দেন সাধারণ ক্রেতাদের উপর।ঢাকায় দ্বিগুণ দামে ইলিশ বিক্রি প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীরা জাগো নিউজকে বলেন, জেলে থেকে ঢাকার সাধারণ ক্রেতা পর্যন্তু ইলিশ পৌঁছাতে চার ধাপ পেরোতে হয়। তাই বরগুনা থেকে কেনা মাছ ঢাকায় এনে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করতে হয়। আর এ কারণেই সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে বাইরে ইলিশ চলে যায় বলে জানান তারা।ইলিশের দাম প্রসঙ্গে বরগুনা জেলা প্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোলাম মোস্তফা চৌধুরী জাগো নিউজকে জানান, জাটকা সংরক্ষণের জন্য বর্তমানে নদী ও সাগরে ছোট ইলিশ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। অন্যদিকে নদী ও সাগরে বড় ইলিশের পরিমাণ খুব কম। তাই চাহিদার সমপরিমাণ ইলিশের যোগান দিতে পারছে না জেলেরা। তাই বাজারে বাজারে ইলিশের দাম বেশি। শনিবার দুপুরে বরগুনা নৌ-বন্দরে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় সোহেল-রুমি নামের এক দম্পত্তির। সোহেল ঢাকায় একটি বে-সরকারি ফার্মে কাজ করেন। আর রুমি গৃহিণী। একটি বক্সে বরফ দিয়ে দু’পিস ইলিশ নিয়ে তারা লঞ্চযোগে ফিরছেন কর্মস্থল ঢাকায়। “ঢাকায় তো ইলিশ পাওয়া যায়, তারপরও বরগুনা থেকে ইলিশ নিচ্ছেন কেন?” জানতে চাইলে সোহেল জানান, বরগুনার তুলনায় ঢাকায় ইলিশের দাম অনেক বেশি। মাস শেষে যে কয় টাকা বেতন পাই, তা দিয়ে টেনে টুনে সংসার চালাই। বেতনের টাকা দিয়ে ঢাকার ইলিশ কেনা সম্ভব না। তাই পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকার তুলনায় এখান থেকে কম দামে ইলিশ কিনে নিয়েছি।এ বিষয়ে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহছেন আলী জাগো নিউজকে বলেন, বাংলা নববর্ষের কারণে বর্তমানে ইলিশের চাহিদা অন্য সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু নদী ও সাগরে সে পরিমাণে ইলিশ নেই। তাই বর্তমানে ইলিশের দাম বেশি। আর বরগুনার ইলিশ ঢাকায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি সম্পর্কে তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং এটি এখন ব্যবসার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। আর চাইলেই মৎস্য অধিদফতর এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।এসএস/এমএস