যশোরে তীব্র গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এ তাপপ্রবাহে মোটাদাগে বৃক্ষ নিধনকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও বনবিভাগ বলছে, ‘যশোরে পর্যাপ্ত গাছ রয়েছে। আর গাছ কাটা হলেও সেই তুলনায় অনেক বেশি গাছ লাগানো হয়েছে।’ আর পরিবেশবিদরা এ উষ্ণায়নের জন্য ছয়টি কারণকে চিহ্নিত করছেন। এর মধ্যে কয়েকটি কারণ যশোরঞ্চলে তাপপ্রবাহে বাড়তি ভূমিকা রাখছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
যশোরে তীব্র ও অতি তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ায় নাগরিকরা বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন। পাশপাশি এ অঞ্চলে বৃক্ষ নিধনের বিষয়টি নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। তবে বনবিভাগ বলছে, যশোরে পর্যাপ্ত গাছ রয়েছে।
যশোর বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জরিপে সারাদেশে বৃক্ষের পরিমাণ ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সেখানে যশোরে এ হার ছিল ২২ দশমিক ৯২ শতাংশ। এর দশ বছর পর চলতি বছর আবার জরিপ হচ্ছে। তবে বনবিভাগের মতে, যশোরে গাছের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
বন বিভাগের তথ্য মতে, চলতি অর্থ বছরে যশোর জেলায় গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে দেড় লাখ। এরমধ্যে ৪০ হাজার গাছ সরকারি স্থানে লাগানো হবে। পাঁচ হাজার গাছ বিনামূল্যে বিতরণ করবে বন বিভাগ। ৩০ হাজার গাছ মাত্র ৯ টাকা দরে বিক্রি হবে। যশোরের শার্শা, চৌগাছা এবং ঝিকরগাছা উপজেলায় ৭৫ হাজার গাছ লাগানো হবে। বিগত পাঁচ বছরে যশোর জেলায় তিন লাখ ৪৫ হাজারটি গাছ লাগানো হয়েছে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, ২০১৪ সালের জরিপে সারাদেশে বৃক্ষের পরিমাণ ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। সেখানে যশোরের হার ২২ দশমিক ৯২ শতাংশ। নতুন জরিপ চলছে। জরিপ শেষ হলে যশোর জেলায় গাছের সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে। তবে যশোরে অনেক গাছ লাগানো হয়েছে। এ কারণে এ হার আরও বেড়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে যশোরাঞ্চলে এ উষ্ণায়নের পেছনে ছয়টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবেশের প্রতি অতীত ও বর্তমানের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক আচরণের পাশাপাশি এ কারণগুলো এ তাপপ্রবাহে সহায়ক ভূমিকা রাখছে বলে দাবি পরিবেশবিদদের। যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে শিক্ষকতা করা প্রফেসর মো. ছোলজার রহমান এখন চট্টগ্রাম কলেজে ভূগোল ও পরিবেশের অধ্যাপক। যশোরাঞ্চলের পরিবেশ নিয়ে তার দীর্ঘদিনের গবেষণা রয়েছে।
প্রফেসর মো. ছোলজার রহমান বলেন, পরিবেশের প্রতি অতীত ও বর্তমানের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক আচরণের পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণ এ অঞ্চলের উষ্ণায়নের জন্য দায়ী। প্রথমত, গত ৬-৭ বছরের মধ্যে এ অঞ্চলের অনেকগুলো সড়ক-মহাসড়কের দুই পাশের বৃক্ষ উজাড় করা হয়েছে। এর মধ্যে যশোর-খুলনা, যশোর-কুষ্টিয়া, যশোর-বেনাপোল, যশোর-নড়াইল, যশোর-চৌগাছা-মহেশপুর সড়ক অন্যতম। জমির হিসেবে সড়কের পাশ থেকে প্রায় আটশ’ হেক্টর গাছ উজাড় করা হয়েছে। অল্প সময়ে একযোগে এই পরিমাণ গাছ কেটে ফেলা একটি বড় কারণ।
দ্বিতীয়ত, করোনাকালে ঘরে অবস্থানের সময় এবং তারপর থেকে ঘরে-অফিসে এসি স্থাপনের হার বেড়েছে। এ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও উষ্ণায়নের আরেকটি কারণ। তৃতীয়ত, সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ অনেক বেড়েছে। নানা ধরণের নির্মাণকাজের ইট-বালি-সিমেন্ট-পাথরসহ নির্মাণ সামগ্রীর কণা ও আঁশ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা তাপ শোষণ ও বিকিরণ করছে। যা তাপমাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চতুর্থত, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে হচ্ছে। এজন্য শস্য আবাদের পরিমাণ-মাত্রা বাড়াতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে রাসায়নিক সার, কীটনাশকের ব্যবহার; মাটিতে কমছে জৈব উপস্থিতি। ফলে মৃত্রিকাও তাপ ধরে রাখছে। এই তাপ বিকিরণও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
যশোর-খুলনা অঞ্চলের পরিবেশে বিরূপ প্রভাবের আরেকটি কারণ জলাশয় ভরাট করে ফেলা এবং জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়া। এ অঞ্চলে প্রচুর জলাশয় ছিল। জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে গেছে। নদী খাল বিল শুকিয়ে গেছে। ফলে জলাশয় যে তাপ শোষণ করতো, তা আর শোষিত হচ্ছে না। এটি এ অঞ্চলের উষ্ণায়নের একটি বড় কারণ।
এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে শুষ্ক মৌসুমে পানির লেয়ার অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। মৃত্রিকা যে তাপ ধারণ করতো, এ পানি তার একটি অংশ শোষণ করে নিতো। কিন্তু লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় এ তাপ বিকিরিত হয়ে পরিবেশে ফিরে যাচ্ছে। একইসঙ্গে প্রচুর কংক্রিটের ভবন ও স্থাপনে ভূ-পৃষ্ঠকে গ্রাস করছে; ঘনঘন বাড়িঘরও প্রচুর তাপ শোষণ করে তা ধরে রাখছে। এসব কারণের সম্মিলন পরিবেশকে উত্তপ্ত করছে; যা এ তীব্র তাপপ্রবাহের জন্য দায়ী বলে মনে করেন প্রফেসর মো. ছোলজার রহমান।
যশোরের পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ওয়ার্ল্ড এনভাইরনমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশিক মাহমুদ সবুজের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়নে শহর থেকে গ্রামে বাড়ছে কংক্রিটের জঞ্জাল। পুকুর জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কাটা পড়ছে গাছ। বাড়ছে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার। এসব কারণে বাড়ছে তাপমাত্রা-বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। এজন্য তিনি পরিকল্পিত নগরায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
মিলন রহমান/আরএইচ/এমএস