বিশেষ প্রতিবেদন

আজ সেই রক্তাক্ত ৬ মে

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকাতে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ও রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর ৬ মে উত্তপ্ত ছিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা। এ দিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে হেফাজতে ইসলাম, স্থানীয় লোকজন ও হেফাজত লেবাসে থাকা জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের টানা সাড়ে ৫ ঘণ্টার ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর একজন সদস্য ও পুলিশের ২ জন সদস্য ছিল। পরে অবশ্য আরো একজন বিজিবি সদস্যের মৃত্যু ঘটে।ওইসব ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে ১৭টি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৭টি মামলার মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে ১১টি ও সোনারগাঁও থানায় ৬টি মামলা হয়। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের ৫টি মামলা ও সোনারগাঁয়ের ৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতের সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান জানান, ৫ মে ঢাকাতে নারায়ণগঞ্জের ৫ জন হেফাজতকর্মী মারা যায়। তাদের মরদেহ পরে প্রত্যেকের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। সংঘর্ষের সময় রাস্তার উপর পড়ে থাকে লাশগুলো :২০১৩ সালের ৬ মে সকালে সিদ্ধিরগঞ্জের মাদানীনগর এলাকায় মাদানীনগর মাদরাসায় অভিযান চালাতে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে মাদরাসা ছাত্র, হেফাজতের কর্মী ও এলাকাবাসী। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলা বিরামহীন এ সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় অনেকে। তাদের লাশ দীর্ঘক্ষণ পড়ে ছিল মহাসড়কের উপরেই।এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনেরা বলছেন, নিহত কেউ হেফাজতের কর্মী না। তারা নিছক নিরীহ। কাজের উদ্দেশ্যেই তারা বাসা থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু বুলেট কেড়ে নিল তাদের প্রাণ। নিহতদের মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জের হিরাঝিল এলাকার মৃত হাশেম কন্ট্রাকটারের ছেলে সাইফুল ইসলাম ছিলেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় ফাহিমা ফ্যাশন এর সেলসম্যান। সকালে দোকানে যাওয়ার পথে তিনি সংঘর্ষে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে সিদ্ধিরগঞ্জের মা হাসপাতাস অ্যান্ড ল্যাবে নেয়া হলে তার মৃত্যু ঘটে। নিহত পথচারী পলাশের (২৫) মাদানীনগর এলাকায় গ্রিল ওয়ার্কশপের দোকান ছিল। বাসের হেলপার জসিম উদ্দিন (৩০) হিরাঝিল আবাসিক এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়। তিনি মিজমিজি ধনুহাজী ঈদগাঁও এলাকায় থাকতো। জাহিদুল ইসলাম সৌরভ (১৭) ছিল এইচএসসি পরীক্ষার্থী। সে সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাশারী বাঘমারা এলাকার এনামুলের ছেলে। পথচারী মাসুম (৩০) শিমরাইল এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা হাসপাতালে মারা যায়। আ. হান্নান (৩৫) সিদ্ধিরগঞ্জের আল আমিন সুয়েটার ফ্যাক্টরির আয়রণ বিভাগের ইনচার্জ ছিলেন। তিনি গুলিবিদ্ধ হলে নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায়। তুরাগ বাস চালক বাবু গাজীকে (৩৬) গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে সুগন্ধা হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায়। তার বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া এলাকায়। ডেমরার পূর্ব বকস নগর এলাকার রইছ মিয়ার ছেলে সাদেক (৩২) দোকানে দোকানে ফিল্টার পানি সরবরাহ করতো। সেও ওই সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে। রিকশা চালক হাবিবুল্লাহ (৩৪) চাঁদপুরের কচুঁয়া থানার জারচরা এলাকার আবুল মুন্সীর ছেলে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ওই দিন মারা যায় হাবিবুল্লাহ। এছাড়া নিহত অপরজন হলেন ট্রাকের হেলপার মিজানুল হক।  সংঘর্ষে বিজিবি-পুলিশের ৪ সদস্য নিহত :সংঘর্ষ চলাকালে এক পর্যায়ে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের রাস্তায় ফেলে বেধড়ক পেটাতে থাকে লোকজন। এতে পুলিশ ও বিজিবির অন্তত ৫০ সদস্য গুরুতর আহত হয়। তাদের দ্রুত শহরের খানপুর ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, ১০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা নেওয়ার পথে ৩ জনের মৃত্যু ঘটে। নিহত বিজিবি সদস্যরা ছিলেন শাহ আলম (৪০), পুলিশের নায়েক ফিরোজ (৩৫) ও কনস্টেবল জাকারিয়া (২৮)। পরে মারা যান সিপাহী লাভলু। ৫ ঘণ্টায় শুধু গুলির আওয়াজ :২০১৩ সালের ৬ মে সকাল ৬ টা হতে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় সময় শুধু শোনা গিয়েছিল গুলির মুহুর্মুহু শব্দ। বিরামহীন শব্দে এলাকায় দেখা দেয় তীব্র আতঙ্ক। পুলিশ জানান, তারা কয়েক হাজার শর্টগানের রাবার বুলেট, চাইনিজ রাইফেলের গুলি ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। এছাড়া প্রচুর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শোনা গিয়েছিল ওই দিন। বেলা সাড়ে ১১টায় পরিস্থিতি শান্ত হলেও টিয়ার সেলের গ্যাসের ঝাঁজ বিরাজ করছিল বিকেল পর্যন্ত। সকাল ৬টা হতে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার এলাকায় লোকজন চলাফেরা করতে পারেনি কাদানে গ্যাসের ঝাঁজের কারণে।এদিকে, সকাল ৬টা হতে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড হতে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুটি লেনের অন্তত ৩০টি গাড়িতে আগুন জ্বালিয়েছিল হেফাজত, জামাত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও এলাকাবাসী। এর মধ্যে ছিল বিজিবি ও পুলিশের গাড়িও। বিভিন্ন যানবাহনের গাড়িও ছিল ভাঙচুরের মধ্যে। সড়কের ৪০-৪৫টি স্থানে টায়ার জ্বালিয়েছিল সংঘর্ষকারীরা। সড়কের অনেক স্থানে বাঁশ, ইটপাটেকল ও রড ফেলে রাস্তায় অবরোধ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সড়কের পাশে তখন মানুষের জটলা, হাতে ছিল বাঁশ আর লাঠিসোটা। অন্যদিকে, সজোয়া যান সহ শত শত র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের ছিল রণপ্রস্তুতি। মহাসড়কের দুই পাশের ভবন আর বিভিন্ন স্থানে থাকা লোকজন গুলির শব্দে ও সংঘর্ষের কারণে আতঙ্কিত ও ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছিল। এসএস/পিআর