শাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের শ্বেতপত্র প্রকাশ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক শাবি
প্রকাশিত: ১১:৩০ এএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ সম্বলিত বেনামে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ২৪ পৃষ্ঠার এ শ্বেতপত্রে উপাচার্যের আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, জামায়াত তোষণ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, বিশ্ববিদ্যালয়কে কুমিল্লায়ন, মেধাবী ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বের করাসহ মোট ৫৩টি পয়েন্টে অভিযোগ তুলে ধরা হয়।

তবে এ শ্বেতপত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।

গতকাল রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যারা বেনামে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে তাদের নৈতিক ভিত্তি অনেক দুর্বল। তারা জ্ঞানপাপী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। ৯৮৭ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে ভাগ বসাতে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে।

শ্বেতপত্রের অভিযোগকে অবাস্তব ও হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন উপাচার্য। আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতার বিন্দুমাত্র সত্যতা ও প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়েন তিনি।

নাম-ঠিকানাবিহীন এ শ্বেতপত্র ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তবে শ্বেতপত্রটি কারা করেছে তা নিয়ে বেশ কানাঘুষাও তৈরি হয়েছে। তবে শ্বেতপত্রে অভিযোগকারীরা নিজেদের নাম প্রকাশ না করলেও ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার শাবিপ্রবির শিক্ষক ও কর্মকর্তাবৃন্দ’ নামে প্রচার করছেন। শ্বেতপত্রটি প্রথম কিস্তি হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশিতব্য বলে শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়।

শ্বেতপত্রে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে উপাচার্যের শাবির গ্র্যাজুয়েটের বিরুদ্ধে অবস্থান ও নিয়োগ বোর্ডে বসে আবেদনকারীদের সঙ্গে বিদ্রুপাত্মক আচরণের বিষয় উঠে আসে। শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতাসম্পন্ন ও মেধাবীদের বাদ দিয়ে নিজ জেলা কুমিল্লার প্রার্থী, নিজের আত্মীয়-স্বজন, নিজ অনুগত শিক্ষকদের সন্তানদের প্রাধান্য দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ করা হয়। সর্বশেষ একজন সিন্ডিকেট সদস্যের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও প্রার্থীদের মধ্যে সর্বনিম্ন যোগ্যতম উপাচার্যের অনুগত কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম দিপুর মেয়েকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া আনোয়ারুল ইসলাম বর্তমানে তার জামাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকানোর চেষ্টায় আছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।

শাবির বিভিন্ন বিভাগের ১ম শ্রেণিতে ১ম, ২য় ও ৩য় হওয়া শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম, ৫০তম, ৬৩তম এমনকি ৭১তম শিক্ষার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নেয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কারও নাম বা তথ্য শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। আরেকটি পয়েন্টে উপাচার্যকে শাবি বিদ্বেষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবার পিএইচডি থিসিসের এক্সামিনার রিপোর্টের ব্যাপারে নগ্ন হস্তেক্ষেপ উল্লেখ করে শ্বেতপত্রে বলা হয়, উপাচার্যের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সদ্য নিয়োগ পাওয়া সহকারী প্রক্টরকে বিধি লংঘন করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে প্রভাবিত করেন।

তবে এসব বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি হলো শিক্ষক। ভালো বীজ থেকে ভালো ফসল হয়। এখানে আপস করলে শিক্ষা ও গবেষণায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিয়োগ বোর্ড যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই নিয়োগ দেবে। কে কোন এলাকার সেটা মুখ্য নই। আমি সেরা শিক্ষার্থীদের নেয়ার চেষ্টা করেছি।

শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্যবীমা চালুর বিষয়ে উপাচার্যের বিশেষ সুবিধা লাভের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে- চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক মাস পূর্ব থেকেই স্বাস্থ্য বীমার নামে শিক্ষকদের বেতন থেকে টাকা কেটে নেয়ার। আরেকটি পয়েন্টে উপাচার্যকে ‘ভিজিটিং ভিসি’ খেতাব দিয়ে সপ্তাহে তিনদিনের বেশি ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন না বলা হয়। এছাড়া উপাচার্যের বাসভবন রিনোভেটের নামে ৪৮ লাখ টাকা অপচয় ও ইন্সুরেন্সের নামে চরম আর্থিম অনিয়মের অভিযোগ আনা হয় শ্বেতপত্রে।

অন্যদিকে একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট বৈঠকে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে বিভিন্নভাবে আনা হয়েছে। বিগত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি এবং সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়ার সময় বরাদ্দকৃত ২০০ কোটি টাকার অর্থ ব্যয় করতে বর্তমান উপাচার্য অক্ষম বলে শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়। এছাড়া সীমানা প্রাচীরকে অহেতুক কাজ বলে উল্লেখ করা হয় শ্বেতপত্রে এবং দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।

তবে উপাচার্য বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যে ৯৮৭ কোটি টাকার প্রকল্প পাস করা হয়েছে। এইটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত কোনো সমস্যা থাকবে না। ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে বলে দাবি করেন তিনি।

এছাড়াও প্রমোশন ও আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে অনিয়ম, দ্বিতীয় গ্রেডে উন্নীতকরণ প্রার্থীদের সঙ্গে বিধিবহির্ভূতভাবে অপমানজনক আচরণ, নিয়মবহির্ভূতভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান ও শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ পরিবর্তন, জোবাইক চালুর নামে প্রতারণা, আইসিভি সম্মেলনের নামে অর্থ অপচয়সহ বিভিন্ন বিষয় শ্বেতপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রমোশন ও আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা অর্জনের পরও কারো প্রমোশন ও আপগ্রেডশন আটকে রেখেছি- এমন কথা সাহস করে কেউ বলতে পারবে না।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষ তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন, ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নীতি নির্ধারক মহলকে আহ্বান জানিয়েছেন শ্বেতপত্র প্রকাশকারী ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার শাবিপ্রবির শিক্ষক ও কর্মকতাবৃন্দ’।

এই মুহূর্তে শ্বেতপত্র প্রকাশের বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন চলছে। এই সুযোগে সরকার ও আমাকে চাপে ফেলতে একটি চক্র এসব কাজ করছে। তাদের উদ্দেশ্য আমাদের চাপে ফেলে উন্নয়ন প্রকল্পে হরিলুট করা। কিন্তু তারা কখনো সফল হতে পারবে না।

জামায়াত তোষণের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দেখি। যোগ্যতা অনুয়াযী সবাই তার প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাবে।

আরএআর/পিআর

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - [email protected]