আবরার হত্যাকাণ্ডে অস্থির হয়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৭ পিএম, ০৯ অক্টোবর ২০১৯

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অস্থির হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নামছেন শিক্ষার্থীরা।

গত রোববার (৬ অক্টোবর) গভীর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে শাখা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নামেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হত্যার বিচারসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। যদিও মঙ্গলবার রাতে বুয়েট ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পর আন্দোলন প্রত্যাহারে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে- জানিয়ে ভিসি বলেন, দাবি একার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, এজন্য সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয় রয়েছে। এসব নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা যেহেতু বিদেশে রয়েছেন, দেশে এলে আলোচনা করে বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তার কথায় সন্তুষ্ট না হয়ে ভিসি ভবনের নিচে প্রায় ৪০ মিনিট তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে কয়েকজন শিক্ষক ও ভিসি নিজে শিক্ষার্থীদের মাথায় হাত বুলিয়ে সেখান থেকে চলে যান। ভিসি চলে গেলেও শিক্ষার্থীরা গভীর রাত পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

বুধবার সকাল থেকে আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতসহ ১০ দফা দাবিতে পালশীর রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা।

buet

আন্দোলনরত একাধিক শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে জানান, আবরার হত্যাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। সহপাঠীকে খুন করে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও পরিবারকে শেষ করে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে আন্দোলনে নেমেছি।

তারা বলেন, আজ আবরারকে হত্যা করা হয়েছে, কাল আমাকে হত্যা করা হবে। বুয়েট ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে আমরা নিরাপদ নই, বুয়েট প্রশাসনকে আমাদের সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষাবান্ধব করতে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিতে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। দাবি আংশিক অথবা শুধু আশ্বাসে নয়, সব দাবি পূরণে বুয়েট প্রশাসন থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারির পর আমরা ক্লাসে ফিরব।

এদিকে আবরার হত্যার ঘটনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শিক্ষার্থীরা মিছিল, বিক্ষোভ, মশাল মিছিল, অবস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্নভাবে আন্দোলন করেন। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। অস্থির হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসগুলো।

ঢাবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছি যে, সরকারদলীয় সংগঠন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে জবর দখল করে আসছে। তবে কেউ আমাদের কথা শোনেনি। সরকার একটি রাষ্ট্রবিরোধী চুক্তি করেছে তা নিয়ে আমার এক ভাই মতামত তুলে ধরায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবাদ-আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের আহ্বায়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইসুল ইসলাম নয়ন বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনার আগে ঢাবি ও বুয়েটে অনেক শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করা হয়েছে। সেগুলোর কিছু প্রকাশ পেয়েছে, কিছু আড়ালেই থেকে গেছে। এসবের পরিবর্তন দরকার।

এ রকম ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না হয় সে জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ-আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। বুয়েট শিক্ষার্থীদের পরবর্তী কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলবে বলে জানান তিনি।

buet

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন টর্চার সেল রয়েছে, আবরার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেটি প্রকাশ হয়েছে মাত্র। এমন টর্চার সেল প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে সহনশীলতার অভাবই এর প্রতিফলন। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন যে সন্ত্রাসের লালন করে তা সমূলে উৎপাটনের জন্য প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে।

আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বুধবার দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে প্রায় দুই ঘণ্টা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের পাদদেশে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেন তারা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরিচালক (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) মো. কামাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড একটি অপ্রত্যাশিত, ঘৃণিত ও দুঃখজনক ঘটনা। এতে আমরা মর্মাহত।

তিনি বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামছেন। এটি সবার জন্য উদ্বেগজন। ইউজিসি বিষয়গুলোর খোঁজ-খবর রাখছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে ইউজিসির পক্ষে কী কী করণীয় তা নিয়ে ভিসিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।

এমএইচএম/এএইচ/এমএআর/এমকেএইচ

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - jagofeature@gmail.com