মিথ্যা মামলায় হাজিরা দিচ্ছেন বিচারপ্রার্থী ‘স্বপন মামা’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:০৭ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২০
ঢাবি ছাত্রীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে ৯ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে আসেন স্বপন মামা। এ সময় নিজের মেয়ের ধর্ষকের বিচার চেয়ে তিনি কেঁদে ফেলেন

প্রায় চার দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) চা বিক্রি করেন ‘স্বপন মামা’ নামে পরিচিত আব্দুল জলিল। নিজের প্রতিবন্ধী মেয়ে ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো স্বপন মামার বিরুদ্ধেই হয়রানিমূলক মামলা করার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে টিএসসিভিত্তিক সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ডাকসু নেতারা।

বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে স্বপন মামার মেয়ের ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আবির রায়হান। তিনি বলেন, টিএসসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মিলন কেন্দ্র। স্বপন মামা এই টিএসসি পরিবারের একজন। তিনি টিএসসিতে চা বিক্রি করেন। কয়েক যুগ ধরে টিএসসিতে চা বিক্রি করতে করতে তিনি টিএসসির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। তার চায়ের কাপ হাতে আমরা স্বপ্ন বুনি, গান গাই। আন্দোলন-সংগ্রাম, আনন্দ-আবেগ, প্রেম-বিরহ ইত্যাদি আমাদের জীবনের বিচিত্র নানা গল্পের সারথি স্বপন মামার চা। টিএসসি মনে মাথা উঁচু করে বাঁচা। প্রগতিশীলতা, সুস্থ সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা, সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সদা জাগ্রত এই প্রাঙ্গণ। অথচ এই জগ্রত পরিবারের সুদীর্ঘকালের সারথি স্বপন মামাই আজ একজন নির্যাতিত মানুষের নাম।

তিনি বলেন, স্বপন মামার মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েকে গত বছর ধর্ষণ করে তার গ্রামের এক লম্পট। বিচার চাইতে থানায় মামলা করেন ব্যথিত পিতা, আমাদের স্বপন মামা। অভিযুক্ত ধর্ষকের গেফতার হওয়ার পর সুবিচার পাওয়ার দিন গুনলেন স্বপন মামা ও তার পরিবার। অথচ সম্প্রতি জামিনে ছাড়া পেয়ে সেই অভিযুক্ত ধর্ষক উল্টো স্বপন মামা ও তার ছেলের নামে মিথ্যা, হয়রানিমূলক মাদকের মামলা করেছে। সার্বভৌম দেশের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার কাছে নাবালিকা মেয়ের ধর্ষণের বিচারপ্রার্থী বাবা উল্টো নিয়মিত হেনস্থার শিকার হচ্ছেন ধর্ষকের সাজানাে মিথ্যা মামলায়। মেয়ের প্রতি জঘন্য অবিচারের বিরুদ্ধে বিচার পেতে দেশের বিচার ব্যবস্থার কাছে গেলেন বাবা, অথচ বিনিময়ে হলেন মিথ্যা মামলার আসামি। এখন তাকে নিয়মিত পুলিশ আদালতে হাজির হতে হয়। মেয়ের বিচারের দাবিতে নয়, নিজের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক প্রকাশ্য মিথ্যা মামলার আসামি হিসেবে হাজিরা দিতে।

টিএসসি সব সময়ই সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে সদা তৎপর উল্লেখ করে ডুজার সভাপতি বলেন, ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হয়ে আমরা, টিএসসির সকল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করে আসছি।আমাদের পরিবারের অংশীজন, আমাদের স্বপন মামার জীবনে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। সদা হাস্যোজ্জ্বল, ক্যাম্পাসের প্রিয়মুখ স্বপন মামার মেয়ে, আমাদের ছােট বােনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এ অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।

সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক বিএম জুবলি রহমান। তিনি বলেন, অভিযুক্ত ধর্ষকের জামিন বাতিল ও তার দায়ের করা নির্জলা মিথ্যা, হয়রানিমূলক মামলা থেকে স্বপন মামাসহ অভিযুক্তদের অব্যাহতি দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। আমরা টিএসসির সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলাে স্বপন মামার পাশে থাকতে কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। এর অংশ হিসেবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় মানববন্ধন, দুপুর ৩টা থেকে টিএসসিভিত্তিক সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে আয়ােজিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিবাদ কর্মসূচি।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এজিএস সাদ্দাম হোসেন, সদস্য তানভির হাসান, রাইসা নাসের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি আব্দুল্লাহ ফয়সালসহ টিএসসিভিত্তিক বিভন্ন সংগঠনের অর্ধ-শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে স্বপন মামা নিজেও উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায্য বিচার দাবি করেন।

প্রসঙ্গত, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বাসুদেব গ্রামে ২০ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী মেয়েসহ আব্দুল জলিলের পরিবার থাকে। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর তার মেয়েকে একই গ্রামের প্রায় ৭০ বছর বয়সী বাচ্চু মিয়া ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। ওই দিনই অভিযুক্তসহ তার দুই ভাই বাহার ও আক্কাসকে আসামি করে মামলা করার পর বাচ্চু মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর ছয় মাস পর পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আসামিকে গত ২৭ নভেম্বর জামিন দেন।

জামিনে বের হয়ে আসামিপক্ষের লোকজন আব্দুল জলিল, তার ছেলে রনি এবং চাচাতো ভাইকে আসামি করে প্রথমে মাদকের এবং পরে ডাকাতির মামলা করেন। তারপর থেকে নিজ মেয়ের শ্লীলতাহানির বিচার ও তার বিরুদ্ধে করা ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন টিএসসির স্বপন মামা। মামলা চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।

আল সাদী/এমএসএইচ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]