ছাগল বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, এখন পড়াশোনা অনিশ্চিত

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বেরোবি
প্রকাশিত: ১১:২৯ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় মাড়েয়া কমলাপুরী গ্রামে বেড়ে ওঠা এক হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান মনির মাহমুদ। পরিবারে অর্থের টানাপোড়েনে বার বার তাকে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় টিউশনি করে নিজের পড়াশুনা চালাতে হয়েছে। মনিরের বাবা মোস্তফা দিনমজুরি করে কোনো মতে সংসার চালান। কিন্তু এমন দারিদ্র্যের মধ্যেও মোস্তফার তিন ছেলে-মেয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে।

জানা গেছে, মনিরের পরিবারে মোট পাঁচজন সদস্য। তার পরিবারে বাবা-মা, বড় এক বোন ও এক ভাই রয়েছে । মনিরের বড় বোন মৌসুমী আক্তার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। আর বড় ভাই হুমায়ুন কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে ৪র্থ বর্ষে অধ্যায়নরত।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়ে পড়াশুনার সুযোগ হয়নি মনিরের। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও অর্থের অভাবে এইচএসএসিতে বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে পারেনি সে। তাই বাবার স্বপ্ন ম্যাজিস্ট্রেট হওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করে মিনর। সে এইচএসসিতে বাণিজ্য বিভাগ থেকে ৪.০০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।

মনিরের বড় ভাইবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাধে আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ধারণা ছিল তার। তাই জানতো ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রাইভেট বা কোচিং দরকার। কিন্তু কোচিং করার মতো টাকা-পয়সা না থাকায় বাড়িতে পড়াশুনা শুরু করে। কিন্তু বাড়িতেও ভর্তি প্রস্তুতির পরিবেশও তেমন ছিল না। তাই গ্রামের বড় ভাই মিঠু তাকে দিনাজপুর নিয়ে টিউশনির ব্যবস্থা করে দেন। টিউশনির পাশাপাশি মনির ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকে দিনাজপুরে। ভর্তি পরীক্ষার সময় হলে অর্থের অভাবে দুটির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারেনি সে । অদম্য মেধাবী মনির যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল সেই দুটিতেই চান্স পেয়েছিল।

মনির বর্তমানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগে ১ম বর্ষে অধ্যায়নরত। সে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় ‘এ’ ইউনিটে ১৪ এবং ‘বি’ ইউনিটে ৪৪ তম স্থান লাভ করে। শুধু বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সি’ ইউনিটে ১৫১ তম হয়েছিল মনির।

মনিরের ইচ্ছা ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। তবে সেখানে নিজের পছন্দের বিষয় না পাওয়ায় ভর্তি হয়নি সে। বাবার স্বপ্ন- ম্যাজিস্ট্রেট হবে মনির, তাই সে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাশন বিভাগে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্য সেই স্বপ্নের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। কোথায় গিয়ে কীভাবে টাকা উপার্জন করা যায় সেই চিন্তায় মনিরের কেটে যায় দিনরাত। নতুন পরিবেশে এসে সহজে টিউশনি না পাওয়ায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন মনির।

মনির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে বাড়িতে ছাগল ছিল। সেগুলো বিক্রি করে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি । এখন আমার পড়াশুনার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য নেই পরিবারের। নতুন পরিবেশে টিউশনিও পাচ্ছি না। বর্তমানে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চিত সময় পার করছি।

মনিরের বাবা মোস্তফা বলেন, আমার অন্য দুই ছেলেমেয়ে ঢাকাতে থাকে। তারা নিজেরা টিউশনি করে চলে। কিন্তু মনিরের এখনো কোনো ধরনের ব্যবস্থা না হওয়ায় তার পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ভর্তির পর কিছুদিন আগে বাড়িতে এসে মনির টাকার কথা বলায় ৫০০ টাকা ধার করে ওকে দিয়েছি। বাড়িতে বিক্রি করার মতোও কিছু নেই যা বিক্রি করে ছেলের পড়াশোনা চালাবো।

আরএআর/পিআর

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - jagofeature@gmail.com