ডাকসুর এক বছর : আসেনি কোনো মৌলিক সমস্যার সমাধান

আল সাদী ভূঁইয়া
আল সাদী ভূঁইয়া আল সাদী ভূঁইয়া , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:০৪ পিএম, ১৬ মার্চ ২০২০

দেখতে দেখতে বছর পেরিয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নতুন নেতৃত্বের। প্রায় তিন দশক পর ২০১৯ সালের ১১ মার্চ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত ডাকসুর প্রতিনিধিদের কাছে অনেক চাওয়া-পাওয়া ছিল শিক্ষার্থীদের। তাদের প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘদিনের আবাসন, পরিবহন, শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগারসহ বিভিন্ন সংকটের একটি ভালো সমাধান এনে দেবে ডাকসু। কিন্তু শিক্ষার্থীদের এসব সমস্যার কোনোটিরই সমাধান করতে পারেনি ছাত্র-সংসদটি। যদিও এক্ষেত্রে ডাকসুর নেতারা খানিকটা ‘কোন্দলকে’ দুষছেন। তবে তারা বলছেন, ডাকসুর এই নতুন নেতৃত্ব অনেক সমস্যারই সমাধানের পথ খুলে দিয়েছে।

বহুল কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচনে ভিপি (সহ-সভাপতি) পদে ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে হারিয়ে জয়ী হন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নুর। আর জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে অধিকার পরিষদের আরেক যুগ্ম-আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খানকে হারিয়ে জয়ী হন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক (পরে অব্যাহতিপ্রাপ্ত) গোলাম রাব্বানী। বাকি এজিএসসহ বেশিরভাগই পদেই জয়ী হন ছাত্রলীগের প্রার্থীরা। কেবল সমাজসেবা সম্পাদক পদে জয়ী হন অধিকার পরিষদের আখতার হোসেন। ডাকসুর নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে বিবাদ থাকলেও শিক্ষার্থীরা তাদের কল্যাণমুখী কাজেরই প্রত্যাশা করেছিলেন ছাত্র সংসদটির তরফ থেকে। কিন্তু গত এক বছরে মৌলিক সমস্যার সমাধানে ডাকসু বিফলই হয়েছে বলছেন শিক্ষার্থীরা। যদিও বিভিন্ন বিভাগে উন্নয়ন ফি কমানো, সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা চালু করা, স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা, জো-বাইক চালু, রিকশা ভাড়া নির্ধারণসহ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে ডাকসুর নতুন নেতৃত্ব।

তীব্র আবাসন সংকট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক সমস্যাগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে আসে আবাসন সংকটের কথা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে তীব্র আসন সংকট রয়েছে। হলের প্রত্যেকটি রুমেই থাকছেন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী। মেয়েদের হলগুলোতে একটি রুম যেখানে চারজনের জন্য বরাদ্দ, সেখানে আটজন থাকছেন। ছেলেদের হলগুলোতে বরাদ্দের তুলনায় দুই থেকে চারগুণ বেশি শিক্ষার্থীও থাকছেন।

মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ২০টি ছোট আকারের গণরুম আছে। যেখানে একটি কক্ষে ১৫-২০ জন করে শিক্ষার্থী থাকছেন। হলের ক্যান্টিনের কিচেনকে ‘লাদেন গুহা’ নামে একটি গণরুমে রূপান্তর করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৮০ জনের মতো শিক্ষার্থী থাকছেন। এই কক্ষে কোনো ধরনের দরজা-জানালা নেই। নেই কোনো আলো-বাতাসের ব্যবস্থা।

বিজয় একাত্তর হলের মেঘনা ভবনের তৃতীয় তলার দুটি গেস্টরুমকে রূপান্তর করা হয়েছে গণরুমে। সেখানে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী একসাথে গাদাগাদি করে থাকছেন।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বারান্দায়ও প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী পর্দা টাঙিয়ে রাত্রিযাপন করছেন। সেখানে শিক্ষার্থীদের পয়ঃনিষ্কাশন, আলো, বাতাস ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের।

Du-inner

জগন্নাথ হলে অনেক বেশি আসন থাকা সত্ত্বেও সেখানে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ ভবনে থাকছেন। অনেক সময় ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে শিক্ষার্থীদের হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৮টি আবাসিক হলের মধ্যে মেয়েদের পাঁচটি হলে কেবল আসন বণ্টন করে থাকে প্রশাসন। ছেলেদের হলগুলোর মধ্যে বিজয় একাত্তর হলে কিছু আসন প্রশাসনিকভাবে বণ্টন করা হলেও অন্য কোনো হলে আসন বরাদ্দে বা শিক্ষার্থীকে কক্ষে ওঠানোর বিষয়ে প্রশাসন কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ থাকে ছাত্রলীগের।

এসব অব্যবস্থাপনা নিয়ে হল সংসদ বা ডাকসুর নেতারা কোনো ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

পরিবহন সংকট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই রাজধানী ও আশপাশের এলাকার বাসস্থান থেকে বাসে যাতায়াত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের সর্বশেষ তথ্যমতে, হলগুলোতে আবাসিক-দ্বৈতাবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৬০ জন। সে হিসাবে ২০ হাজারের মত শিক্ষার্থী প্রতিদিন বাসে ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া করেন। এই শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন রুটে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস রয়েছে ৬৩টি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একতলা বাস রয়েছে ১৩টি। তার মধ্যে আবার একটি নষ্ট এবং আরেকটি সংস্কারাধীন। অর্থাৎ এখন চালু বাস আছে ১১টি। আর ভাড়া করা বিআরটিসির দোতলা বাস রয়েছে ৫০টি। একতলা বাসে ৫২টি আসন আর দোতলা বাসে ৮৪টি আসন। হিসাবে সবগুলো বাসে মোট আসন সংখ্যা ৪৭৭২টি। ২০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য এই সংখ্যক আসন যে নিতান্তই অপর্যাপ্ত, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

দীর্ঘদিনের দাবির পরও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য নতুন কোনো বাস যুক্ত হয়নি। বাসগুলোকেও তেমন কোনো ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হচ্ছে না। ফলে বাদুড়ের মত ঝুলে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

Du-inner

গ্রন্থাগার ও ক্লাসরুম সংকট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে পড়াশোনার জন্য শিক্ষার্থীদের লাইন দিন দিন দীর্ঘ হলেও বাড়ছে না আসন। সেজন্য অনেক শিক্ষার্থী সকালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও আসন পাচ্ছেন না। হলের পাঠকক্ষগুলোতেও শিক্ষার্থীদের ব্যাপক চাপ রয়েছে।

অন্যদিকে বিভিন্ন বিভাগের একটি ক্লাসরুমে কয়েকটি ব্যাচের ক্লাস হচ্ছে। সেজন্য এক ব্যাচের ক্লাস শেষ না হতেই আরেক ব্যাচ দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো বিষয়ে পাঠদান শুরু হলেও সে বিষয় শেষ করার আগেই ক্লাসের ইতি টানতে হয়। অনেক সময় বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ক্লাস খুঁজে বের করতে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

অনিরাপদ ক্যাম্পাস
জনসাধারণের প্রবেশ উন্মুক্ত থাকার কারণে নগরের প্রাণকেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ আসছেন। এতে বিভিন্ন সময় চুরি, ছিনতাই ও ইভটিজিংয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। গত এক বছরেই এমন ঘটনা শতাধিক।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস তাদের জন্য দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

যা বলছেন শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ডাকসু হওয়ার ফলে ক্যাম্পাসে কিছু পরিবর্তন হয়েছে৷ যদিও আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। গণরুম বন্ধ ও মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টন- এসব না হলেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। মূলকথা এবারের ডাকসুর মাধ্যমে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ডাকসুর কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে সামনে আরও অনেক কিছুর পরিবর্তন হবে।

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রেজাউল ইসলাম বলেন, ডাকসু হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার নিয়ে অন্তত কথা বলতে পারছেন। এটা ডাকসু হওয়ার সবচেয়ে বড় অর্জন। আমরা যদি এখন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি তাহলে সময়ের ব্যবধানে তা কাজে পরিণত হবে। ক্যাম্পাসের এখনকার পরিস্থিতি অবশ্যই ডাকসু হওয়ার আগের চেয়ে অনেক ভালো। অন্তত এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার্থী মনে করতে পারছেন।

Du-inner

যা বলছেন ভিপি-জিএসরা
পরিবহন সংকটের বিষয়ে ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক শামস-ঈ-নোমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে শুরু থেকে বাস বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছি। সর্বশেষ ডাকসুর সভায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রুটে অন্তত একটি আপ ও একটি ডাউন ট্রিপ বাড়ানোর কথা বলছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বাজেটে তিনটি নতুন বাস কেনা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-সংশ্লিষ্ট সমস্যার বিষয়ে ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী বলেন, আমরা ডাকসুতে আসার পর অনেক কাজ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন অসহযোগিতার কারণে তা করতে পারিনি। আবাসিক সমস্যার সমাধানের জন্য নতুন হল নির্মাণের কথা বলেছি। হলে বাঙ্ক বেড স্থাপনের জন্য ডাকসু সভায় অনেক শক্তভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছি। কিন্তু তারা একটি বাঙ্ক বেডও স্থাপন করেনি। শুধু ডাকসু চাইলেই আবাসিক সমস্যার সমাধান হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে৷ আমাদের কাজ চাপ প্রয়োগ করা, আমরা চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছি। পরিবহন সমস্যা নিয়েও ডাকসুর বিভিন্ন সভায় সবাই একত্রে কথা বলেছে। নতুন বাস সংযোজন ও প্রতি রুটে ট্রিপ বাড়ানোর কথা বলেছি। কিন্তু প্রশাসন তা-ও করেনি। আমরা আর কিছুদিন অপেক্ষা করব। যদি না হয় তাহলে আমরা শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব সমস্যার বিষয় ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার আদায়ের বিষয়ে বলতে গেলে মূলত আমরা ব্যর্থ। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক কাজ করতে চেয়েছি। কিন্তু ছাত্রলীগের হামলার কারণে তা-ও করতে পারেনি। হলগুলোতে আবাসিক সমস্যা সমাধানে আমরা প্রশাসনকে বারবার বলেছি। কিন্তু প্রশাসন তা করেনি। আবাসিক সমস্যা সমাধানে ডাকসুর চেয়ে প্রশাসনকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী থাকতে হবে।

পরিবহন সংকট ও নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়ে ভিপি বলেন, পরিবহন সমস্যা সমাধানে তিনটি বাস কিনতে বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা রাজি করিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন সমস্যা সমাধানে বাস কিনতে পারা আমাদের একটা বড় অর্জন। আর ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে। ক্যাম্পাসে অপরাধমূলক কাজের সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ কারণে ডাকসুতে সবচেয়ে বেশি ছাত্রলীগের নেতারা থাকলেও তারা এসব বিষয়ে কথা বলছেন না।

এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - jagofeature@gmail.com