পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিতে চাই

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ০৩:২১ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

২০১৭ সালের ২১ আগস্ট শাবিপ্রবির ১১তম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। ঢাবির শিক্ষকতা জীবনে তিনি চারবার শিক্ষক সমিতির সভাপতি, পাঁচবার সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও দুবার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন।

শাবিপ্রবিতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় সাড়ে তিন বছর ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন দশক পূর্তিতে সার্বিক বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের শাবিপ্রবি প্রতিনিধি মোয়াজ্জেম আফরান।

জাগো নিউজ : উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন সে সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। ওই সময় প্রথম কোন বিষয়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছিলেন?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : শিক্ষা এবং গবেষণায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন দরকার ছিল। তিন দশকে শিক্ষকতার জায়গা অনেক অগোছালো ছিল। সেখানে গুরুত্বারোপ দরকার ছিল। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় গুরুত্বারোপ করি। সাড়ে তিন বছর পর একটা স্বস্তির জায়গায় এসেছি।

জাগো নিউজ : শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব অগোছালো পেয়েছিলেন সে সম্পর্কে যদি বলতেন...

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : ক্লাস নেয়ার ক্ষেত্রে কিছু সংখ্যক শিক্ষকরা যত্নশীল ছিলেন না। তারা নিয়মিত ক্লাসে যেতেন না। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্লাস না নিয়েই কোর্স শেষ করতেন। এখন প্রায় সব শিক্ষক সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। চমৎকারভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।

জাগো নিউজ : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে অঙ্গীকার নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু সেই লক্ষ্য পূরণে তিন দশকে সফলতা কতটুকু বলে মনে করছেন?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : শুরু থেকেই দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে শাবিপ্রবি নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। অনেক উদ্ভাবন দেশ-বিদেশে সুনাম কুঁড়িয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা উদ্ভাবন প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘আইসিটি গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’ এবং ‘ডিজিটাল ক্যাম্পাস অ্যাওয়ার্ড-২০১৯’ অর্জন করেছে শাবিপ্রবি।

jagonews24

জাগো নিউজ : সম্প্রতি স্কোপাস ডাটাবেজের প্রতিবেদনে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শাবিপ্রবি প্রথম স্থান অর্জন করে। এ সাফল্যের পেছনের কথা জানতে চাই?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : শিক্ষা ও গবেষণায় যে পরিবেশ দরকার তা তৈরির চেষ্টা করেছি। এখন রাতদিন গবেষণা হচ্ছে। ল্যাব সবসময় খোলা থাকছে। গবেষণায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রথম এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছি। আগামীতে লক্ষ্য উভয়ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অর্জন করা। সম্প্রতি ওয়েব মেট্রিক র‌্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। ল্যাবে নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় ও গবেষণায় বাজেট সাতগুণ বাড়ানো হয়েছে।

গবেষণার মান বৃদ্ধিতে আরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গবেষণা প্রকল্পে প্ল্যাগারিজম চেকের জন্য ‘টার্ন-ইট-ইন’ পদ্ধতি চালু করেছি। এখানে সমস্যা থাকলে প্রকল্প বাতিল হয়ে যাবে। পরে গবেষণার প্ল্যাগারিজম যাচাই করি। এরপর চূড়ান্ত প্রতিবেদন পরীক্ষা করি।

মাস্টার্স ও পিইচডি থিসিসও ‘টার্ন-ইট-ইন’র আওতায় আনা হয়েছে। নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রমোশনের ক্ষেত্রে তাদের গবেষণা প্রতিবেদন সফটওয়্যারে পরীক্ষার মাধ্যমে জমা দিতে হয়। তখন প্ল্যাগারিজমের মাত্রা বোঝা যায়। ফলে গবেষণার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে।

শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে ভাতা সাতগুণ বৃদ্ধি, সেমিনার, কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের অ্যালাউন্স চালু, আইইএলটিএস, জিআরই বা জিম্যাট ইত্যাদির অনুদান চালু, পোস্ট ডক্টরাল গবেষণায় এক বছর স্ববেতনে শিক্ষা ছুটির ব্যবস্থা এবং সেরা গবেষকদের জন্য ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে ‘ডিন’স অ্যাওয়ার্ড’ চালু করা হয়েছে।

জাগো নিউজ : বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট নিরসনে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : সেশনজট মারাত্মক আকারে ছিল। চার বছরের কোর্স শেষ করতে সাত-আট বছর লাগত। এছাড়া এখানে একটা নিয়ম ছিল- কেউ চাইলেই আজীবন ছাত্র থাকতে পারত। এটা এবং সেশনজট অনেক পীড়া দিয়েছে।

দেশের বেশিরভাগ নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সেশনজটের কারণে কর্মজীবনে প্রবেশে দেরি হওয়ায় অভিভাবকদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও চাপ পড়ে। আবাসন ব্যবস্থা, শিক্ষক স্বল্পতা, ক্লাসরুমের সীমিত সুযোগ-সুবিধায় প্রভাব পড়ে। এসব আমাকে ভাবিয়ে তোলে। এজন্য সেশনজট শূন্যের কোটায় আনার চিন্তা করি।

এছাড়া সেশনজট নিরসনে সেমিস্টার সিস্টেম অর্ডিন্যান্স হালনাগাদ করা হয়। নন-মেজর কোর্সগুলো নিজ নিজ বিভাগের অধীনে আনা হয়। সেমিস্টার পরীক্ষা যথাসময়ে অনুষ্ঠিত ও অধ্যাদেশ অনুসারে ১৫ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া দ্রুত ফল প্রকাশে সফটওয়্যারের সক্ষমতা বাড়ানো করা হয়। এসব কারণে সেশনজট এখন নেই বললেই চলে।

jagonews24

জাগো নিউজ : বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান দুই উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে যদি বলতেন...

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : প্রায় ১২০০ কোটি টাকার দুটি উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ২৩টি ভবনের মধ্যে সাত-আটটির কাজ শুরু হয়েছে। বাকিগুলোর কাজ দ্রুত শুরু হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে আগামী ১০০ বছর শাবিপ্রবিতে অবকাঠামোগত কোনো সমস্যা থাকবে না। এতে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হবে।

জাগো নিউজ : উপাচার্য হিসেবে সাড়ে তিন বছরে সফলতাগুলো যদি বলতেন?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করেছি। এছাড়া সব ধরনের নিয়োগ, পদোন্নতি, আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণার উন্নত পরিবেশ, অবকাঠামোগত শক্ত অবস্থান, জ্ঞান অর্জন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনন্য নজির স্থাপন করেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়।

জাগো নিউজ : করোনাকালীন সময়ে জনসেবায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কেমন ছিল?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : সে সময় নিজস্ব অর্থায়নে করোনা শনাক্তকরণ ল্যাব চালু করা হয়। ফলে সিলেটের অন্যান্য ল্যাবের ওপর চাপ কমে। এটা দেশের অন্যতম সেরা ও নির্ভরযোগ্য একটি ল্যাব, যা একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। এমনকি ঈদের দিনও চালু ছিল।

জাগো নিউজ : করোনায় শিক্ষা কার্যক্রম কেমন ছিল?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : করোনার মধ্যে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ছিল ‘ওয়ান অব দ্য বেস্ট’। অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ নিশ্চিতে ২ হাজার ২৫০ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে মাসে ১৫ জিবি করে নেট দেয়া হচ্ছে। অনলাইন ক্লাসের লজিস্টিক সামগ্রী সংগ্রহে সব শিক্ষককে ১০ হাজার এবং তরুণ শিক্ষকদের ল্যাপটপ কিনতে বিনা সুদে ৫০ হাজার টাকা করে সহজশর্তে ঋণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া অনলাইন ক্লাস সুষ্ঠুভাবে নিতে শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জাগো নিউজ : এবারই প্রথম গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং শাবিপ্রবি এতে অংশ নিচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে কী? ভর্তি পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কেমন হবে?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ভোগান্তি কমবে। ভর্তি পরীক্ষায় আমরা কো-কনভেনার হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবো।

জাগো নিউজ : শাকসু ও সিনেট নির্বাচন হচ্ছে না কেন?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিষয় আটকে থাকবে না। এসব বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এগোতে হবে। সবকিছুই সময় মতো করবো।

jagonews24

জাগো নিউজ : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যেসব দক্ষতা আপনার ভালো লাগে?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : শিক্ষার্থীরা সব ক্ষেত্রেই ভালো করছে। তাদের কোয়ালিটি অনেক ভালো। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সম্মান নিয়ে আসছে। প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে বিতর্ক, গান, আবৃত্তি ও খেলাধুলায় জড়িত। তাদের সব সময় অ্যাপ্রিশিয়েট করি।

জাগো নিউজ : শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। দেশ এবং জাতির জন্য প্রস্তুত করতে হবে। পরিবারের কথা ভাবতে হবে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ভালো কাজে অন্যদেরও উৎসাহিত করতে হবে। তারা একা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের পাশে আছে। যত ধরনের সহযোগিতা লাগবে আমরা দেব। তারা এগিয়ে গেলে আমরাও এগিয়ে যাব।

জাগো নিউজ : উপাচার্য হিসেবে আপনার লক্ষ্য কী?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে সবাই যেভাবে দেখতে চায় আমরা তা পূরণ করে যাচ্ছি। একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছি। এখানে আর্থিক অনিয়ম যেন না হয়, সুশাসন, স্বচ্ছতা যেন থাকে- এসব বিষয় নিশ্চিত করেছি।

জাগো নিউজ : বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা ও গবেষণায় একটি রোলমডেল হিসেবে তৈরি করতে কী ধরনের কাজ করেছেন?

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : শাবিপ্রবিকে রোল মডেল হিসেবে তৈরি করতে যা প্রয়োজন তা ঠিকভাবে করার চেষ্টা করছি। আমি যখন থাকব না আশা করি তখনো এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নেতৃত্ব দেব। এটাই আমার প্রত্যাশা। আমাদের অগ্রগতি যেন অব্যাহত থাকে। সত্যিকার অর্থে যেন রোল মডেল হিসেবে দেশের মধ্যে অবস্থান ধরে রাখতে পারি।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও যেন আমাদের অবস্থান জানান দিতে পারি। এখন আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যাওয়া। এ জায়গায় যাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার তা করছি। ইউজিসি ও সরকারের সহযোগিতা পাচ্ছি। তাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা।

জাগো নিউজ : জাগো নিউজকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।

মোয়াজ্জেম আফরান/এসএমএম/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]