অচেনাদের রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ করছেন তারা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
প্রকাশিত: ০১:৫৩ পিএম, ১৪ জুন ২০২১

আত্মীয়তার বাইরেও মানুষের মাঝে এক অপার্থিব ভালোবাসা রয়েছে। চাওয়া-পাওয়া কিংবা সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকে এই সম্পর্ক। এমন একটি বিষয়ের নাম ‘রক্তদান’। এই ভালোবাসার বহি:প্রকাশ হিসেবে চেনা-অচেনা মানুষের জীবন বাঁচাতে সবসময় প্রস্তুত থাকেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল ‘রক্তযোদ্ধা’।

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষকে রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ করছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা রক্তদাতাদের পাঁচজন রক্তদানের আনন্দময় কিংবা তিক্ত-সিক্ত অভিজ্ঞতায় জাগো নিউজের কাছে অনুভূতি তুলে ধরেছেন।

দেবজ্যোতি সানি

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি সানি প্রতি ৪ মাস অন্তর অন্তর রক্তদান করেন। গত ৮ মে ১৮তম বারের মতো রক্তদান করেন তার এক আত্মীয়কে, যিনি রক্তশূন্যতায় ভুগছিলেন।

তিনি বলেন, রক্তদান সবসময় ভালোলাগার ব্যাপার। কিন্তু, কিছু বাজে অভিজ্ঞতাও আছে। অনেক সময় কাউকে রক্ত দিতে গিয়ে দেখি রোগীর উপস্থিত স্বজনদের রক্তদানের সামর্থ্য আছে কিন্তু তারা দিচ্ছে না। বিষয়টি খারাপ লাগলেও আমাদের দেশে এটা কমন সমস্যা। এসব ব্যাপারে আরও সচেতনতা বাড়ানো উচিত।

কেন রক্তদান করেন জানতে চাইলে বলেন, আমাদের সবার উচিত একে অপরকে সাধ্যের মধ্যে সাহায্য করা। সেই সাহায্যের জন্যই রক্তদান করা। রক্তদানের মাধ্যমে একজন মানুষের উপকার হলে যে ভালোলাগা কাজ করে, অন্য কোনো কাজের মাধ্যমে তা উপলব্ধি করা যায় না। আর হ্যাঁ, রক্তদান করাটা সম্পূর্ণই মানবিক বিষয়। আমি রক্তদান করি আমার মানবিকতা থেকে। আমার ভালোলাগার জন্য।

অমিতাভ গোস্বামী নিলয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী অমিতাভ গোস্বামী নিলয় মোট ১৭ বার রক্তদান করেছেন। রক্তদান তার কাছে নেশার মতো। তার রক্তের গ্রপটাও দুর্লভ, ‘ও’ নেগেটিভ।

তিনি বলেন, আমাদের শরীরের এমন একটা অংশ যেটা ১২০ দিন পর এমনিতেই নষ্ট হয়ে যায়, সেটা দিয়ে যদি একজন মানুষের জীবন বাঁচে তাহলে রক্তদান কেন নয়? রক্তদান আমাদের শরীরকে প্রাণচঞ্চল এবং কর্মক্ষম রাখে। তাই আমার মনে হয় সবারই নিয়মিত রক্ত দান করা উচিত।

নীহার রঞ্জন দাশ

লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী নীহার রঞ্জন দাশ রক্তদান করেছেন মোট ১৬ বার। তিনি ২০১৬ সালে সর্বপ্রথম রক্তদান করেন।রক্তদানের প্রথম অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আমার এক বন্ধুর খালাকে রক্ত দিয়েছিলাম। তখন আমার সেমিস্টার ফাইনাল চলছিল, তাই প্রথমে রক্ত দিতে চাচ্ছিলাম না। পরে রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে নিজের মধ্যে সাহস তৈরি হয়।

তিনি বলেন, রক্ত দেয়ার আগে অনেক নার্ভাস ছিলাম। তবে রক্ত দেয়ার সময় বন্ধুরা পাশে ছিল, তারা অনেক সাহস যুগিয়েছে। রক্ত দেয়ার পর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি। রক্ত দেয়ার পর প্রথমই রোগীর সাথে দেখা করি, তখন উনি আমাকে নিজের ছেলের মতো বানিয়ে নেন।

জীবনে প্রথম রক্ত দিতে গিয়ে রোগী এবং তার আত্মীয়দের এমন আচরণে আমি সত্যিই বিমোহিত হয়েছিলাম। তখন থেকেই নিজের মধ্যে একটা সংকল্প করি যে যতই সমস্যায় থাকি না কেন, রোগীকে বাঁচাতে রক্ত দিতে কখনই পিছপা হব না। আর এভাবেই রক্ত দিয়ে মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। অচেনা, অজানা মানুষকে রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ করছি।

এসএম হোসাইন রেফাজ অমি

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের এসএম হোসাইন রেফাজ অমি মোট ১৬ বার রক্তদান করেছেন। রক্তদান এবং রক্তদাতা খুঁজে বের করাই জীবনের সবচেয়ে ভালো কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, কলেজ থেকেই মোটামুটি রক্ত দেয়া শুরু করেছিলাম। প্রথমবার রক্ত দেয়ার পর দেখলাম রোগীর আরও রক্ত প্রয়োজন, তখন আরও প্রায় ৪ ব্যাগ ম্যানেজ করে দিয়েছিলাম ওইদিন। তখন রোগীর আত্মীয়ের মুখটা দেখে যে প্রশান্তি পেয়েছিলাম মোটামুটি সেদিনই নিজের ভেতর একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ইনশাআল্লাহ এই কাজে যতদিন সম্ভব থাকব।

কারণ এই কাজের মাধ্যমে আমরা তো একদম রোগীর রক্তে মিশে যাই এবং সারাজীবন মিশে থাকি তার এবং তার পরিবারের প্রার্থনায় এবং তাদের ভালোবাসার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকতে চাই যুগ যুগ ধরে।

মো. সুমন মিয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সুমন মিয়া সর্বমোট ১৫ বার রক্তদান করেছেন। ‘যতদিন বেঁচে আছি ততদিন মানুষের বিপদে পাশে থাকব’ উল্লেখ করে রক্তদানের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, আমার রক্ত দেয়া শুরু হয় ২০১৫ এর রমজানে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ের জন্য ঢাকা আগারগাঁও থাকতাম। হঠাৎ একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভাই তার পরিচিত এক চাচার জন্য রক্ত দিতে বললো। কিছুটা অসুস্থ্যবোধ করলেও রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে সারাদিন রোজা রেখেও সন্ধ্যায় রক্ত দিতে যাই।

চাচাকে রক্ত দেয়ার পর নিজের ভেতর যে আত্মতৃপ্তি এবং ভালোলাগা কাজ করেছিল, সেই থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য একটা অনুভূতি কাজ করে।

মোয়াজ্জেম আফরান/এমআরএম/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]