একমাস আগেই উধাও জাবির লেকের পরিযায়ী পাখি

মাহবুব সরদার
মাহবুব সরদার মাহবুব সরদার , বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক,জাবি
প্রকাশিত: ০৮:১৫ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২২
পরিযায়ী পাখিশূন্য জাবির লেক। ছবি-মাহবুব সরদার

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) লেকে পুরো জানুয়ারি মাসজুড়েই দেখা মেলে পরিযায়ী পাখির। বিশেষ করে জানুয়ারির প্রথমদিকে পরিযায়ী পাখির আগমন বেড়ে যায়। তবে এবার হয়েছে ব্যতিক্রম। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই পাখিশূন্য লেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের লালপদ্ম-ঢাকা জলাশয়ের টানে এ বছর যথাসময়ে পরিযায়ী পাখি এলেও তারা ফিরে গেছে অনেকটা আগেভাগেই।

প্রচণ্ড শীত আর খাদ্য সংকট মোকাবিলায় হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি জাবির লেকে ভিড় জমায় পরিযায়ী পাখি। প্রতিবছর শীতের শুরুতেই সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, হিমালয় অঞ্চল থেকে উষ্ণতার খোঁজে চলে আসে ভীনদেশি পাখির ঝাঁক। শীতের রুক্ষতা কেটে বসন্তের আগমনে তারা ফিরে যায় তাদের চিরচেনা ভূমিতে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে প্রথমবারের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। প্রধানত দুই ধরনের পাখি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলোতে আসে। একদল পাখি ডাঙায় শুকনো স্থানে বা ডালে বসে। আরেক ধরনের পাখি বসে পানিতে। পানিতে বসা পাখিদের বেশিরভাগই হাঁসজাতীয়। এর মধ্যে সরালি, জলপিপি, পচার্ড, ফ্লাইফেচার, গার্গেনি, ছোট জিরিয়া, পান্তামুখী, পাতারি, মুরগ্যাধি, কোম্বডাক, পাতারি হাঁস, জলকুক্কুট, খয়রা, মানিকজোড়, কলাই, ছোটনগ ও বামুনিয়া হাঁস অন্যতম।

jagonews24

প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জাবির লেকগুলোতে পরিযায়ী পাখি আসা শুরু করে। নভেম্বরের শেষের দিক থেকে পাখির পরিমাণ বাড়তে থাকে। ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারির শুরুতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ পাখির দেখা মেলে।

পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রতিবছর যথাসময়ে লেক পরিষ্কার করা, লেকের পাড় ঘেঁষে বেড়া দেওয়া, সতর্কতামূলক বিলবোর্ড টাঙানো প্রভৃতি কাজ করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এত কিছুর পরও এবছর অনেক আগেই জাবি থেকে ফিরে গেছে পরিযায়ী পাখি।

jagonews24

মঙ্গলবার (৪ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি বসার লেকগুলো ঘুরে দেখেন এ প্রতিবেদক। তবে আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের সামনে ও নতুন রেজিস্ট্রার ভবনের পেছনের লেক, পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের পেছনের লেক, ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারের সামনের লেক ও পরিবহন চত্বরের পেছনের লেকে কোনো পরিযায়ী পাখি চোখে পড়েনি।

আগেভাগেই পরিযায়ী পাখি চলে যাওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি মেলার আহ্বায়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হাসানের কাছে।

jagonews24

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘শীতের শুরুতে যে পরিমাণ পরিযায়ী পাখি এসেছিল, তা দেখে আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু গত কয়েকদিনে হঠাৎ পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যে দুইটা লেকে সবসময় পাখি বসে সে দুইটা লেক বলতে গেলে একেবারেই পাখিশূন্য।’

হঠাৎ পাখি চলে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করেছেন এ অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘বড় লেকটার সমস্যা হচ্ছে লেকের ওপরে থাকা টং দোকানগুলোর পেছনের জায়গাটা পুরোপুরি সমতল করে ফেলা হয়েছে। আগে সেটা জঙ্গলে ঢাকা ছিল। লোকজন সবসময় সেখানে আড্ডা দিচ্ছে। ফলে পাখি আর লোকজনের মধ্যে কোনো আড়াল থাকছে না।’

jagonews24

তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে ট্রান্সপোর্ট এলাকায় রাতে উচ্চ শব্দে গান বাজানো হয়েছিল। ট্রান্সপোর্ট এলাকার লেকেই বেশি পরিমাণে পাখি থাকে। হয়তো তারা এ শব্দে ভড়কে গেছে। পাখির প্রতি এরকম আচরণ চলতে থাকলে পাখি অবশ্যই তুলনামূলক নিরাপদ জায়গা বেছে নেবে। সেটা হয়তো জাহাঙ্গীরনগরের বাইরের কোনো জায়গা।’

পাখিদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে কয়েকটি লেকের কচুরিপানা পরিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে ভেতরের দিকের লেকগুলো পরিষ্কার করা হয়নি।

এ বিষয়ে অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, ‘পাখি বসার বড় যে লেক সেটা এবার পরিষ্কার করা হয়নি। কচুরিপানার শিকড় মাটি পর্যন্ত নেমে গেছে। তারপরও সেখানে কিছু পাখি এসেছিল। ঠান্ডার কারণে পাখির বিশ্রাম নেওয়া ও রোদ পোহানোর জন্য কচুরিপানা দরকার। তবে কচুরিপানা খুব বেড়ে যাওয়ায় মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ কমে গেছে।’

মাহবুব সরদার/এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।