৮ বছর পর জাবিতে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন, নেই ছাত্র প্রতিনিধি

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ০৮:৫০ পিএম, ১১ আগস্ট ২০২২

পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আট বছর পর উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে তিনটি প্যানেলে আওয়ামীপন্থী ৯ শিক্ষক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন। সাবেক ভারপ্রাপ্ত এক উপাচার্য শিগগির আরও একটি প্যানেল ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে। তবে জাতীয়তাবাদী শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তারা এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না।

শুক্রবার (১২ আগস্ট) সিনেটের এক বিশেষ সভায় এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে একজন সিনেটর সর্বোচ্চ তিনটি ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচিত প্রথম তিনজনের নাম উপাচার্য হিসেবে মনোনয়নের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। সেখান থেকে একজনকে উপাচার্য হিসেবে মনোনীত করা হবে।

এই নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা চার ভাগে বিভক্ত হয়েছেন। যাদের নেতৃত্বে রয়েছেন সাময়িক উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম, সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আমির হোসেন, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোতাহার হোসেন এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক এম এ মতিন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ বলেন, শুক্রবার (১২ আগস্ট) বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিতব্য বিশেষ সিনেট সভার একমাত্র আলোচ্যসূচি ‘উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন’। এই নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৮১ জন সিনেটর।

তিনি বলেন, সিনেট সভা চলাকালে একজন প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীর মাধ্যমে প্রার্থিতা ঘোষণা দেওয়া যাবে। সভার নির্দিষ্ট সময় প্রচারণার জন্য বরাদ্দ রাখা হবে। পরে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচন শেষে প্রথম তিনজনের একটি প্যানেল আচার্য তথা রাষ্ট্রপতির কাছে মনোনয়নের জন্য প্রেরিত হবে।

এদিকে, এই নির্বাচন উপলক্ষে এরই মধ্যে তিনটি প্যানেল ঘোষিত হয়েছে। তবে সাবেক ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক এম এ মতিনের নেতৃত্বে আরও একটি প্যানেল অপেক্ষমাণ রয়েছে যা রাতের মধ্যে ঘোষণা করা হবে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অফিসে অধ্যাপক নূরুল আলমের নেতৃত্বে একটি প্যানেল ঘোষণা করা হয়। যেখানে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার ও গণিত বিভাগের অধ্যাপক লায়েক সাজ্জাদ এন্দেল্লাহ্ প্যানেল সহযোগী হিসেবে থাকবেন। বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের একাংশ হিসেবে অধ্যাপক মো. নূরুল ইসলামের নেতৃত্বে এই প্যানেলটি গঠিত হয়েছে।

এর আগে বুধবার রাতে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একাংশের সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’র পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আমির হোসেন একটি প্যানেল ঘোষণা করেছেন। সেখানে প্যানেল সহযোগী হিসেবে রয়েছেন উয়ারী ও বটেশ্বরের আবিষ্কারক প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এবং বাংলা বিভাগের অধ্যাপক পৃথ্বিলা নাজনীন নীলিমা।

একইদিন বিকেলে কলা অনুষদের শিক্ষক লাউঞ্জে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদা আখতারের নেতৃত্বে ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ’র একাংশ আরও একটি প্যানেল ঘোষণা করে। যেখানে তিনি নিজে অংশগ্রহণ করবেন না বলে নিশ্চিত করেছেন। এই প্যানেলে রয়েছেন- শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. মোতাহার হোসেন, প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবদুল্লা হেল কাফি ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক তপন কুমার সাহা।

সিনেটররা জানান, মোতাহার-কাফি-তপন এবং নূরুল-অজিত-এন্দেল্লাহ্ প্যানেল সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম পন্থী বলে বিবেচিত। তাছাড়া আমির-মোস্তাফিজ-নাজনীন প্যানেল সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবীরের অনুসারী।

জানা যায়, নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। যাদের একটি পক্ষ শোকাবহ আগস্টে নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এদের নেতৃত্বে রয়েছেন বর্তমান কোষাধ্যক্ষ রাশেদা আখতার। তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও তার সমর্থিত প্যানেল হিসেবে কাজ করছে মোতাহার-কাফি-তপন প্যানেল।

এদিকে, আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একাংশের সংগঠন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের পক্ষে আমির হোসেন-মোস্তাফিজুর রহমান-পৃথ্বিলা নাজনীন নীলিমা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

এর আগে, অধ্যাপক আমির হোসেন ও অধ্যাপক মো. নূরুল আলমের ঐক্য প্যানেল গঠনের আলোচনা চললেও তা বিভিন্ন কারণে সফল হয়নি।

অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়কে সুসংহত করে গড়ে তোলা। এজন্য শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতি চর্চা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে অধ্যাপক আমিরের নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চাই।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাবেক ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক এম এ মতিন বলেন, আমার পক্ষ থেকেও আওয়ামীপন্থীদের একটি প্যানেল উপাচার্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।

এনিয়ে মোট চারটি প্যানেলে ১২ জন প্রার্থী উপাচার্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যাদের সবাই আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত।

ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই নির্বাচন

জানা যায়, অধ্যাদেশের ১৯ (১)-এর ‘কে’ ধারা অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধিদের পাঁচটি পদ গত ৩০ বছর ধরে শূন্য রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সিনেটে প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

ছাত্রদের দাবি, শুধু ছাত্রদের পাঁচটি পদ না বরং সিনেটের ৯৩টি পদের মধ্যে ৬৩টি পদেই মনোনয়ন অথবা নির্বাচনের প্রয়োজন আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর ১৯(১) ধারা অনুসারে ৯৩ জন মনোনীত ও নির্বাচিত সদস্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট গঠিত হবে। তবে বর্তমান সিনেটের বৈধ সদস্য ও প্যানেল নির্বাচনের ভোটার সংখ্যা ৮১ জন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ‘অধ্যাদেশের ১৯(১)-এর ‘ই’ ধারা অনুযায়ী আচার্য কর্তৃক মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদের মেয়াদ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। অধ্যাদেশের ১৯(১)-এর ‘জে’ ধারা অনুসারে শিক্ষক প্রতিনিধিদের নির্বাচিত ৩৩ জনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে চার বছর আগে। অধ্যাদেশের ১৯(১)-এর ‘আই’ ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ২৫ জনের তিন বছর মেয়াদও গত বছরে শেষ হয়েছে। এতে অধ্যাদেশের নিয়ম অনুযায়ী সিনেটের ৬৩টি সদস্যপদে নতুন করে মনোনয়ন ও নির্বাচনের প্রয়োজন রয়েছে।

তবে ৬৮ জন সদস্যের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও তাদের পদ শূন্য হচ্ছে না অধ্যাদেশে বর্ণিত ১৯(২) ধারার কারণে। এতে উল্লেখ আছে, সিনেটরদের দায়িত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত বহাল থাকবে, যতক্ষণ না তাদের উত্তরাধিকার নির্বাচিত, মনোনীত ও নিয়োগপ্রাপ্ত হয়।

ছাত্র প্রতিনিধি না থাকার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল বলেন, সিনেটে ছাত্রপ্রতিনিধি না থাকাটা হতাশাজনক। ৩০ বছর ধরে জাকসু না থাকাতে সিনেটে কোনো ছাত্রপ্রতিনিধি নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা চাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণকারী যে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আসুক। যিনি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষা, গবেষণা সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে কাজ করে যাবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আবু সাইদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সিনেটের অধিকাংশ সদস্য মেয়াদোত্তীর্ণ। এই ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনের কোটাভিত্তিক ভোটার দিয়ে প্রহসনমূলক নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি নেই। ছাত্র প্রতিনিধি নেই এমন নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। আমরা চাই আগে জাকসু নির্বাচন হোক এবং বৈধ ছাত্র প্রতিনিধি নিয়ে ভিসি প্যানেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি থেকে নির্বাচিত সিনেটর শিহাব উদ্দীন খান বলেন, দীর্ঘদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মেনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভিসি প্যানেল নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি না থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের পছন্দ বা ইচ্ছা প্রকাশের সুযোগ থাকছে না, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। আমাদের দাবি, প্যানেল নির্বাচনের পর যিনিই ভিসি পদে নিয়োগ পান, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করবেন এবং সিনেটকে পরিপূর্ণতা দেবেন।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যাশা করি উন্নয়ন প্রকল্পে যে সমস্ত দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর অনুসন্ধান ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন নতুন উপাচার্য। আশা করি, একজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ মানুষ নির্বাচনের পথ ধরে উপাচার্য মনোনীত হবেন।

এর আগে, সর্বশেষ উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। সে সময় আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ থেকে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে জয়লাভ করেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম।

মাহবুব সরদার/এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।