রাত বাড়লেই সক্রিয় হয় ঢাকা কলেজের ‘ছিনতাইচক্র’

মো. নাহিদ হাসান
মো. নাহিদ হাসান মো. নাহিদ হাসান , ঢাকা কলেজ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০০ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২২

দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজ। পাশেই শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)। কলেজ সংলগ্ন এলাকায় নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চন্দ্রিমাসহ বেশ কয়েকটি বড় মার্কেট। সকাল-সন্ধ্যা তাই লোকজনের আনাগোনায় জমজমাট থাকে পুরো এলাকা। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটির কিছু শিক্ষার্থীর কারণে মিডিয়ায় নেতিবাচক শিরোনাম হতে হয়েছে বারবার। সম্প্রতি কলেজের সামনে ও আশপাশ এলাকায় বেড়েছে ছিনতাই। সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এর সঙ্গে জড়িত কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি চক্র। রাত যত গভীর হয় এই চক্রের তৎপরতা তত বাড়ে।

সম্প্রতি ঘটা কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

গত ১ আগস্ট রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে বন্ধুর জন্মদিন উদযাপন করতে ধানমন্ডি এলাকায় আসেন ১৮-২০ বছর বয়সী সাত বন্ধু। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ ঢাকা কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের মোবাইলফোন, নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। পরে ঢাকা কলেজের এক সাবেক শিক্ষার্থী বিষয়টি হলের এক ‘সিনিয়রকে’ জানালে ছিনতাই হওয়া তিনটি মোবাইলফোন উদ্ধার হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের কাছ থেকে নেওয়া চারটি মোবাইলফোনের মধ্যে তিনটি ফেরত পেয়েছেন। আর খোয়া যাওয়া নগদ ১২ হাজারের কিছু বেশি টাকা ফেরত পাননি।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ভুক্তভোগী আবির (ছদ্মনাম) জাগো নিউজকে বলেন, আমরা বন্ধুর জন্মদিন উদযাপন শেষে বাসায় ফিরছিলাম। এর মধ্যে ঢাকা কলেজের সামনে থেকে ছয়জন এসে আমাদের ধরে নিয়ে যায়। টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। আমাদের ছুরি, চাকু দেখিয়ে ভয় দেখায়। পরে আবার একটা নম্বর থেকে ফোন করে আমাদের তিনটি মোবাইল ফেরত দেওয়া হয়।

আরেক ভুক্তভোগী ফাহিম (ছদ্মনাম) বলেন, আমরা রিকশায় বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ আমাদের রিকশা থামিয়ে গালাগালি করতে থাকেন কয়েকজন। এরপর আমাদের ধরে নিয়ে মোবাইলফোন, টাকা ছিনিয়ে নেয়। আমাদের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিট আটকে রেখেছিল তারা।

jagonews24

ওইদিনের ছিনতাইয়ের ঘটনার কয়েকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জাগো নিউজের হাতে এসেছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঢাকা কলেজের সঙ্গে লাগোয়া জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) গলি দিয়ে ১৩ জন যুবক প্রবেশ করছে। এর মধ্যে সাত ভুক্তভোগী আর ছয়জন ছিনতাই চক্রের সদস্য। প্রথমে তাদের ঢাকা কলেজের হল গেটের (৩ নম্বর গেট) ভেতরে নিয়ে মোবাইলফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে আবার বের হয়ে তাদের নায়েমের গেটের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ভুক্তভোগীদের নিয়ে কলেজের সামনের মিরপুর সড়কের দিকে চলে যায় ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইকারী চক্রের একজনের গায়ে ঢাকা কলেজের লোগো সম্বলিত টি-শার্টও দেখা যায়।

ফুটেজে দেখা যায়, ছিনতাইচক্রের সদস্যরা ভুক্তভোগী সাত যুবকের ঘাড়ে হাত দিয়ে গল্পের ছলে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে আসে। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এরাই ছিনতাই করতে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বিষয়টি আঁচ করতে পারলেও ভয় দেখিয়ে তাদের মুখ বন্ধ রাখা হয়। তাই পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেও তারা সাহায্য চাইতে পারে না।

এ ধরনের ঘটনা খুব কাছ থেকে দেখেছেন ঢাকা কলেজের এমন কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তারা বলেন, ছিনতাইয়ের এই চক্রটি কাজ এমনভাবে করে যাতে কেউ ধরতে না পারে। অনেক সময় রাতে রাস্তায় টহল পুলিশ থাকে, তখন তারা এসব করে না। আবার কাউকে ধরে আনার ক্ষেত্রে তারা কলেজ ক্যাম্পাসকেই বেছে নেয়। কেননা ক্যাম্পাসে বিনা অনুমতিতে পুলিশ প্রবেশ করতে পারে না।

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা কলেজের সামনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ছিনতাইয়ের শিকার হন। ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর নাম ইকরা। তিনি ছাত্রলীগ সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয়ের বোন ইনিন তাজরিনের বান্ধবী। ঘটনাটি ছাত্রলীগ সভাপতি জানতে পারলে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। পরে ভুক্তভোগী ছাত্রী তার মোবাইলফোন ফেরত পান। এমন ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে।

তথ্য বলছে, চক্রের সদস্যরা কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করেন। রাত যত বাড়ে তত সক্রিয় হয় তারা। এমনকি ভোর পর্যন্ত চলে তাদের এ অপতৎপরতা।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, এই ছিনতাইকারী চক্রটি ঢাকা কলেজের হলের কিছু ‘বড় ভাই’ নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার বিপদে পড়লে ওই বড় ভাইরাই তাদের উদ্ধারে করেন। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই চক্রটি প্রতিনিয়ত এসব কাজ করে যাচ্ছে। এদের অনেকে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

পুলিশের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, নিউমার্কেট এলাকায় ছিনতাই করতে বাইরের এলাকা থেকে অনেক ছিনতাইকারী আসে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ঢাকা কলেজের কোনো বড় ভাইকে জানিয়ে আসে যাতে বিপদে পড়লে উদ্ধার হতে পারে।

কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছে, গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর এসব কাজের জন্য কলেজের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তাই যারা এসব ঘটনা ঘটায় তাদের কলেজ থেকে বহিষ্কার করে আইনের আওতায় আনা উচিত।

পুলিশ বলছে, ছিনতাইয়ের এসব ঘটনা ঘটলেও অভিযোগ না আসায় তারা ব্যবস্থা নিতে পারে না। ডিএমপির নিউমার্কেট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিনিয়তই পুলিশের নিয়মিত টহল টিম অভিযান অব্যাহত রেখেছে। অনেকে আটকও হচ্ছে। প্রয়োজনে আমরা পুলিশের টহল আরও বাড়াবো। কলেজ প্রশাসন উদ্যোগী ভূমিকা পালন করলে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সংযোগ থাকতে হবে এবং প্রশাসনকে সহায়তা করতে হবে।

১ আগস্টের ঘটনার পরদিন (২ আগস্ট) ঢাকা কলেজের উপাধ্যক্ষ (ওই সময়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন) অধ্যাপক এটিএম মইনুল হোসেন বলেছিলেন, দেশের স্বার্থ ও আইনবিরোধী যে কোনো কাজে যদি কেউ যুক্ত থাকে তবে তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে পারে। কলেজ এলাকার বাইরে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার দায় আমরা নিতে পারবো না। এটি সম্পূর্ণই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তারা যদি মনে করেন কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে তবে তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, আমি নতুন যোগ দিয়েছি। এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে পারবো না।

এমআইএইচএস/এএসএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।