ঋণ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ


প্রকাশিত: ১২:১১ পিএম, ২১ এপ্রিল ২০১৭
ঋণ নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ

রাজশাহীর মোহনপুরের কাশিমালা গ্রামের গৃহবধূ নাসিমা খাতুন। ভাগ্য বদলের আশায় ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবে গেছেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় গৃহকর্মী হিসেবে সেদেশে গেছেন নাসিমা।

আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ৪০ হাজার টাকা ঋণ। নাসিমার স্বামী তরিকুল ইসলাম জানান, এরই মধ্যে ঋণের অধিক টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। টাকা জমাতেও শুরু করেছেন।

সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরতে শুরু করেছে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরের গৃহবধূ নাদিরা বেগমেরও। ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নাসিমা খাতুনের সপ্তাহখানেক আগে তিনিও বিদেশে পাড়ি জমান। তার স্বামী আব্দুল গফুর জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় ঋণ পরিশোধ করছেন তিনি।

তবে এরই মধ্যে ঋণের এক লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন রাজশাহী নগরীর কয়েরদাঁড়া এলাকার পুষ্প বিশ্বাস। গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি হংকং গেছেন তিনি।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের রাজশাহী শাখার হিসাবে, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহীতে চালু হওয়া ব্যাংকটির শাখা থেকে ঋণ নিয়ে ৬০০ জনের উপরে বিদেশে গেছেন। এদের মধ্যে ৪০ জন নারী। সবমিলিয়ে ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ হারে এরই মধ্যে আদায় হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ৪২ লাখ ৯ হাজার টাকা।

ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি জানিয়েছে, ঋণগ্রহীতা নারীরা কেউ ঋণ খেলাপী নন। সময়মত ঋণ পরিশোধ করছেন তারা। অনেকেই পরিশোধও করেছেন। তবে বেশকিছু পুরুষ ঋণ গ্রহীতা ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করছেন।

জেলার বাগমারা উপজেলার বাজেকোলা কাতিলা এলাকার সোহাগ আলী প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সিঙ্গাপুরে গেছেন। কিন্তু উকিল নোটিশ পাঠানোর পর পরিশোধ করেছেন মাত্র ১০ হাজার ২০০ টাকা। সুদসহ এখনো বকেয়া এক লাখ ১২ জাহার টাকা। এরই মধ্যে তার নামে মামলা দায়ের করেছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।

এমন মামলা হয়েছে একই উপজেলার গাঙ্গোপাড়ার কামারবাড়ির আব্দুল কুদ্দুস, জেলার মোহনপুরের মৌগাছি আকুবাড়ির মোস্তফা মন্ডল ও নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার লিচামারা মোসিন্দার মোস্তাফিজুর রহমানের নামে। আরো কয়েকজনের নামে মামলার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

তবে ব্যাংক সহায়তা ছাড়াও বিদেশে গেছেন অনেকেই। সবমিলিয়ে ২০১১ থেকে এ বছরের ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন রাজশাহী অঞ্চলের ৫৯ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৪৬৫ জনই নারী। আর পুরুষ বিদেশে গেছেন ৪৫ হাজার ১৫২ জন।

রাজশাহী জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের সহকারী পরিচালক আব্দুল হান্নান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের সবেচেয়ে বেশি ১৮ হাজার ৮১১ জন বিদেশ গমন করেছেন নওগাঁ থেকে। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৮ হাজার ৪১১ জন, রাজশাহীর ১১ হাজার ৭৭৩ জন এবং নাটোরের ১০ হাজার ৬২২ জন বিদেশে গেছেন। সবচেয়ে বেশি মানুষ গেছেন সৌদি আরবে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় যাচ্ছেন লোকজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিভাগের নাটোর ও নওগাঁ জেলায় কর্মসংস্থান অফিস নেই। এসব জেলার বিদেশ গমনেচ্ছুরা রাজশাহী থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি বিদেশগামীদের স্মার্ট কার্ডের ছবি ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ শুরু হয়েছে রাজশাহীতে। কিন্তু এখনো স্মার্ট কার্ড পেতে ধর্ণা দিতে হচ্ছে প্রবাসী কল্যাণ ভবনে।

এতে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বিদেশ গমনেচ্ছুরা। দিনে দিনে বহির্গমন ছাড়পত্রের অনুমোদনসহ স্মার্ট কার্ড নিয়ে কর্মীরা বিদেশে চলে যেতে পারবেন এমন কথা বলা হলেও বাস্তবে তা মিলছে না। তবে খুব শিগগিরই রাজশাহী থেকে স্মার্ট কার্ড মিলবে বলে জানিয়েছেন রাজশাহীর অফিস প্রধান।

তবে নানান কারণে এখনো রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ বিদেশ গমনের দিক থেকে পিছিয়ে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অঞ্চলের মানুষ পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে সেভাবে সচেতন নন। আর্থিক অনটনও এর আরেকটি কারণ।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইলিয়াস হোসেন বলেন, বড় স্বপ্ন, কর্মের সুযোগ না পাওয়া ও প্রদর্শনেচ্ছা ইত্যাদি কারণে মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায়। তবে সমতল ভূমির মানুষেরা সহজ সরলভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের চাহিদাও সীমিত। মোটামুটিভাবে জীবনযাপনে তারা অভ্যস্ত।

এছাড়া এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম থাকায় জীবনের ঝুঁকি কম। ফলে বিদেশ গমনের দিক দিয়ে এ অঞ্চলের মানুষ অনেকাংশে পিছিয়েছে। তবে ধীরে ধীরে এ চিত্র পাল্টে যাচ্ছে।

ফেরদৌস সিদ্দিকী/এফএ/এমএস