রাজশাহী নগরী এখন আবর্জনার ভাগাড়!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী
প্রকাশিত: ০১:৩৮ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৭

বিশ্বের নির্মল বাতাসের শহরখ্যাত রাজশাহী নগরী এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কর্মচারী আন্দোলনের জেরে টানা তিনদিন ধরে বন্ধ এখনকার বর্জ্য অপসারণ। ফলে বিভিন্ন পয়েন্টে জমা হয়েছে গৃহস্থালি বর্জ্য। এতে পথচারীসহ নগরবাসী পড়েছে চরম দুর্ভোগে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন নগরীর বাাসা বাড়ি থেকে ভ্যানে করে ময়লা সংগ্রহ করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। কোথাও কোথাও নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন তারা। এরপর সেগুলো নেয়া হয় সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনগুলোতে। সেখান থেকে প্রতিরাতেই বর্জ্য সরিয়ে নেয়া হয় নগরীর বাইরের ভাগাড়ে।

এছাড়া প্রতিরাতেই নগরীর ময়লা আবর্জনা ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে নেয় রাসিক। ভোরে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন নগর পান বাসিন্দারা। আর পুরো এই কার্যক্রমে নিয়োজিত দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীরা।

কিন্তু গত রোববার থেকে ১১ দফা দাবিতে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছেন এসব কর্মচারী। সেদিন থেকেই কর্মবিরতি চলছে। ফলে সরেনি নগরীর বর্জ্য। এতেই সৃষ্টি হয়েছে জনদুর্ভোগ।

নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা দেখা গেছে, নির্ধারিত ডাস্টবিন উপচে পড়ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। কোথাও কোথাও রাস্তার ওপরেই ফেলে রাখা হয়েছে ময়লা। সেকন্ডোরি ট্রান্সফার স্টেশনগুলোও ময়লায় পূর্ণ। উপচে পড়েছে আশেপাশের রাস্তায়। অপসারণ না করায় উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এরই মধ্যে থেমে থেমে নামছে বৃষ্টি। এতে ময়লা-কাদাজল হয়ে পড়েছে একাকার।

রাসিকের পরিচ্ছনতা বিভাগ বলছে, সংস্থাটির পরিবহন শাখায় তালা দিয়েছেন আন্দোলনকারী কর্মচারীরা। এতে ময়লা সংগ্রহে নিয়োজিত একটি গাড়িও বের হতে পারেনি। আন্দোলনকারীদের বাধায় নামেনি ভ্যানগুলো। বাধা দেয়া হয়েছে রাত্রীকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও। এতেই ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে নগরী। তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ভাষ্য, দাবি আদায়ের জন্যই তাদের এ কর্মবিরতি। 

চলমান আন্দোলনে টানা তৃতীয় দিনের মতো তালাবদ্ধ শহীদ এএইচ এম কামারুজ্জামান চিড়িয়াখানা ও কেন্দ্রীয় উদ্যান। 

এতে বিনোদনপ্রেমীরা পা বাড়চ্ছেন নগরীর বড়কুঠি পদ্মাপাড়ের অডভার মুনক্সগার্ড পার্কে। কিন্তু সেই পার্কের প্রবেশ পথেই ময়লার স্তূপ। সেখানকার সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন ছাপিয়ে ময়লা জমেছে রাস্তায়। এতে বিব্রত আগতরা।

বড়কুঠি এলাকার বাসিন্দা ছাবির শেখ জানিয়েছেন, প্রতিদিনই সেখানে ময়লা জমা হয়। প্রতিদিনই সরিয়ে নেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। কিন্তু তিনদিন ধরে ময়লায় ঢাকা পড়েছে পুরো এলাকা। আগে কখনো এমন দৃশ্য চোখে পড়েনি। 

ময়লা জমেছে নগরীর অন্যতম পাইকারি সবজিবাজার সাহেববাজার মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজারেও। এ নিয়ে ভোগান্তির অন্ত নেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের। 

নগরীর সাগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রায়হান মিলন এ নিয়ে জানালেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, জনগণকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের নামে আন্দোলন অযৌক্তিক। এ নিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

কর্মচারী আন্দোলনে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করেছেন রাসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও ১৩নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রবিউল আলম মিলু। 

তিনি বলেন, গ্যারেজে তালা দিয়ে সমস্ত গাড়ি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাসাবাড়িতে ময়লা সংগ্রহকারীদের ভ্যান নিয়ে নামতে দিচ্ছে না কয়েকজন শ্রমিক নেতা। এক কথায় অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এমননিতেই নগর সংস্থায় অতিরিক্ত দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী রয়েছে। আয় সীমিত হওয়ায় বেতন পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে রাসিক। এই পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই বেতন বাড়ানো সম্ভব নয়। বিষয়টি আন্দোলনকারীদেরও জানা। তা সত্ত্বেও কেন এই আন্দোলন? এর পেছনে একটি গোষ্ঠীর ইন্ধন স্পষ্ট বলেও দাবি করেন এই কাউন্সিলর।

এদিকে, তৃতীয় দিনের মতো মঙ্গলবার সকালেও নগর ভবনের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করেছেন কর্মচারীরা। 

এতে নগর ভবনে প্রবেশে ব্যর্থ হয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী। রাসিক কর্মচারী ইউনিয়নের ব্যানারে চলমান এ আন্দোলনে থামকে গেছে সকল নাগরিক সেবা কার্যক্রম। 

রাসিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল শেখ জানান, তাদের প্রধান দাবি মজুরি বৃদ্ধি। এটি তাদের ন্যায়সংগত দাবি। তারা স্থায়ী কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতিরও দাবি জানিয়েছেন। 

এছাড়া স্থায়ী কর্মচারীদের গৃহনির্মাণ ঋণ, মৃত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পোষ্যদের চাকরি এবং মৃত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের অবসরকালীন ভাতা প্রদান করতে হবে। স্থায়ী কর্মচারীদের বদলি, শোকজ ও বরখাস্ত বন্ধ এবং বরখাস্তকৃতদের চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে।

সাংগঠনিক কাঠামো সংশোধন করে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী, কল্যাণ তহবিল বাস্তবায়নে চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে হবে। স্থায়ী কর্মচারীদের পোশাক, জুতা ও ছাতা সকল বকেয়া পাওনা পরিশোধ করতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোনলনকারীরা।

দাফতরিক কাজে রোববার থেকে ঢাকায় অবস্থান করছেন রাসিক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। কয়েক দফা যোগাযোগ করে মেয়রের মুঠোফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা নাগাদ মেয়রের রাজশাহী ফেরার কথা। রাতেই এ নিয়ে বৈঠবে বসবেন তিনি।

ফেরদৌস সিদ্দিকী/এএম/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :