সিলেটে হাত-পা বেঁধে কিশোর নির্যাতনের ঘটনায় এসআই প্রত্যাহার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সিলেট
প্রকাশিত: ০২:৩৫ পিএম, ০৬ নভেম্বর ২০১৭

সিলেটের গোয়াইনঘাটে পূর্ববিরোধের জের ধরে মোবাইল চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কিশোর রাসেলকে (১৭) গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন এবং পরে মাদকসহ তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় সোমবার বিকেলে উপজেলার মানাউড়া গ্রাম থেকে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া সালুটিকর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুশংকর পালকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

গত ২৯ অক্টোবর উপজেলার মানাউড়া পূর্বপাড়া গ্রামে সোহেল নামে এক কিশোরকে মোবাইল ফোন চুরির অপবাদ দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। হাত-পা বেঁধে মারধরের ভিডিও ধারণ করে নির্যাতনকারীরা। পরে তাকে ইয়াবা বড়ি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মাদকের মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে প্রেরণ করে।

এ ঘটনায় সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) আবুল হাসনাত খানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া নির্যাতনকারী ইসবর আলী (৬০) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছে থানা পুলিশ।

সিলেট জেলা পুলিশের (বিশেষ শাখা) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার সোমবার রাতে জানান, এ ঘটনায় সালুটিকর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক সুশংকর পালকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।

নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরের ভাই ফিরোজ আলী জানান, তার ভাই সোহেল পেশায় একজন নির্মাণ শ্রমিক। পরিবারের অর্থের জোগান দিতে সে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করত। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ঘটনার দিন সকালে সোহেলকে বাড়ির সামনে থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মোবাইল ফোন চুরির মিথ্যা অভিযোগে গাছের সঙ্গে দুই হাত ও পা বেঁধে ওই গ্রামের বাসিন্দা ইসবর আলী বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তাকে বেধড়ক পেটান।

তিনি আরও বলেন, নির্মম ওই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করা হয়। কিন্তু কৌতূহলি মানুষ জটলা পাকিয়ে এমন নির্মম দৃশ্য দেখলেও তার আর্তচিৎকারে কারও মন গলেনি। এমনকি তাকে উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেননি। পিটুনির এক পর্যায়ে কান ধরে উঠবস করিয়ে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে মাদকের মামলা করে পুলিশ। এছাড়া মামলার এজাহারে তার বয়স বাড়িয়ে ১৮ বছর লেখা হয়েছে।

রাসেলের পরিবারের অভিযোগ, রাসেলকে যখন পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয় তখন গ্রামের আজিজুর রহমান ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহসহ এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।

গত বছরের ১১ মে ওই গ্রামের আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগে গোয়াইনঘাট থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন রাসেলের মা। আর এ কারণেই পূর্বশত্রুতার জের ধরে সোহেলকে মিথ্যা চুরির অভিযোগে নির্যাতনের বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই আব্দুল্লাহ ও তার চাচাতো ভাই আজির উদ্দিন দুজন মিলে মাদকের মামলা সাজিয়েছেন।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আজিজুর জানান, আমি ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলাম কিন্তু তাকে মারধর করিনি। আর পুলিশ তাকে কোনো মামলায় চালান দিয়েছে তা আমার জানা নেই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য খোয়াজ আলী বলেন কেউ যদি চুরি করে তাহলে তাকে আইনের কাছে সোপর্দ করা উচিত। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাকে মারধর করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যে বা যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান তিনি।

এ ব্যাপারে সালুটিকর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও রাসেলের বিরুদ্ধে করা মাদক মামলার বাদী উপ-পরিদর্শক সুশংকর পাল জানান, ঘটনার দিন স্থানীয় কয়েকজন লোক ইয়াবাসহ ছেলেটিকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। নির্যাতন ও ভিডিও ধারণের বিষয়টি তিনি জানেন না।

মামলার এজাহারে বয়স বাড়িয়ে লেখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করার পর তারা যা জানিয়েছে তাই লিখেছি।

গোয়াইনঘাট থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) হিল্লোল রায় জানান, কিশোর নির্যাতনের ঘটনায় সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) আবুল হাসনাত খানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে কিশোরকে হাত ও পা বেঁধে পেটানোর অভিযোগে ইসবর আলী নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার সাথে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের আটক করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি।

সোমবার রাতে জেলা পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোমবার একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘এক কিশোরের উপর এতো আক্রোশ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে তাৎক্ষণিক ঘটনার সত্যতা ও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) আবুল হাসনাত খানকে সভাপতি, জেলার বিশেষ শাখার সহকারী পুলিশ সুপার মুহাম্মদ নুরুল আবছার খাঁন ও সিলেট পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ক্রাইম শাখার পুলিশ পরিদর্শক (নি.) সৈয়দ সফিকুল ইসলাম মুকুলসহ তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ছামির মাহমুদ/আরএআর/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :